শসা চাষ, শসার অজানা ব্যবহার, এবং শসার উপকারিতা।

শসা চাষ, শসার অজানা ব্যবহার, এবং শসার উপকারিতা,
শসা চাষ

শসার চাষ পদ্ধতি:
• শসা চাষে জলবায়ু ও মাটি,
• শসার জাত,
• জীবনকাল,
• শসা চাষে সময়,
• শসা চাষে চারা উৎপাদন,
• চাষের উপযুক্ত জমি তৈরি ও চারা রোপন,
• শসা চাষে সার প্রয়োগ/ব্যবস্থাপনা,
• শসা চাষে সেচ ও পানি নিষ্কাশন,
• শসা চাষে আগাছা ও নিড়ানি,
• শসা চাষে পোকামাকড় ও রোগদমন,

শসা আমাদের দেশে জনপ্রিয় একটি সবজি। শসা শুধু সালাত হিসেবে নয় সবজি হিসেবেও খাওয়া যায়। শসার মধ্যে অধিকাংশ থাকে পানি। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়,শসার প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য অংশে ৯৬% জলীয় অংশ, ০.৬ গ্রাম আমিষ, ২.৬ গ্রাম শ্বেতসার, ১৮ মিঃ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.২ মিঃ গ্রাম লৌহ, ক্যারোটিন ৪০ মাইক্রোগ্রাম, খাদ্যপ্রাণ সি ১০ মিঃ গ্রাম রয়েছে। আমাদের দেশে শসা সালাদ তালিকার প্রথম রাখা হয়। এছাড়াও শসা রূপ চর্চার জন্যও ব্যবহার করা হয়। শসা ও খিরা খেতে প্রায় একই রকম হলেও দুটি একটু আলাদা। আসুন জেনে নেই শসার চাষ পদ্ধতি।

শসা চাষে জলবায়ু ও মাটি:
শসা উৎপাদনের জন্য উর্বর দো-আঁশ মাটি
হলে ভাল হয়। শসা সারা বছর হলেও ২৫
থেকে ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার মধ্যে
ভালো হয়। অধিক তাপমাত্রা, দীর্ঘ দিবস ও প্রখর আলোত বেশি পুরুষ ফুল উৎপন্ন হয়।

শসার জাত:
আমদের দেশে বিভিন্ন জাতের শসার চাষ
হয়ে থাকে। যেমন- বারোমাসি , পটিয়া জায়ান্ট, শিলা, আলাভী, বীরশ্রেষ্ঠ , শীতল, হিমেল, গ্রীন ফিল্ড, পান্ডা, ভেনাস, মাতসুরি, বাশখালী, মধুমতি, নওগা গ্রীন, লাকী ৭ ইত্যাদি। বেশির ভাগই চাষ করা হয় হাইব্রিড জাতের শসা। বর্তমানে আমাদের দেশে হাইব্রিড জাতের অনেক শসা বাজারে পাওয়া যায়।

জীবনকাল:
শসার জীবন কাল সাধারণত জাত ভেদে ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত।

শসা চাষে সময়:
বাংলাদেশে শসার বীজ বপনের উপযুক্ত
সময় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত।

শসা চাষে চারা উৎপাদন:
নার্সারী বা বীজ তলায় চার তৈরী করে জমিতে লাগানো যায়। শসার বীজ জমিতে বেড তৈর করে বা পলিথিনের ছোট প্যাকেটে বপন করা যায়। যেভাবেই চারা উৎপাদন করা হোক না কেন আগে মাটিতে জৈব সার মিশিয়ে নিতে হবে। চারা লাগানোর ক্ষেত্রে আলাদাভাবে শসার চারা তৈরি করে নিতে হবে। ভালো জাতের বীজ নির্বাচন করতে হবে। বীজ বপনের ২৪ ঘণ্টা আগে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পলিব্যাগে, কলার খোলে বা বেড তৈরি করে চারা তৈরি করে নেয়া যায়। প্রতি মাদায় ৪-৫ টি বীজ পুঁতে দিতে হবে। তবে মনে রাখবেন পলিব্যাগে চারা তৈরি করা নিরাপদ।

এক্ষেত্রে অর্ধেক গোবর ও অর্ধেক মাটি পলিব্যাগে ভরতে হবে। এরপর উক্ত মাটি দ্বারা পলিব্যাগ ভরতে হবে। পলিব্যাগের মাটি ভরাট করার পরে রেখে দিতে হবে। এবং উপরে ছাউনি দিয়ে দিতে হবে। যাতে রোদ, বৃষ্টি না লাগে। মাঝেমধ্যে পলিব্যাগের মধ্যে ঝাঁঝরি দিয়ে পানি সেচ দিয়ে পলিব্যাগের মাটিতে চারা
লাগানোর জো আনতে হবে। এরপর প্রতিটি ব্যাগে ২ থেকে ৩ টি চারা রোপন করতে হবে। চার দুপাতা হলে প্রতি পলিব্যাগে একটি করে চারা রেখে বাকি চার তুলে ফেলতে হবে।

শসা আকৃতিতে লম্বা হয়। শসা প্রায় ৮/১০ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। শসার গায়ের রঙ সবুজ। তবে পাকলে হলুদ রঙের হয়। ভেতরে সাদাটে সবুজ রঙের এবং মধ্যভাগে বিচি থাকে।

চাষের উপযুক্ত জমি তৈরি ও চারা রোপন:
শসা গাছের চার লাগানোর পূর্বে ৩- ৪ বার গভীর চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। আগাছামুক্ত ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। চাষের সময় জমিতে সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেসব জমি উঁচু ও বর্ষার পানি আটকে থাকে না এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। শসার চাষ করে ক্ষেত্রে বেড তৈরি করে দিতে হবে। এবং প্রতি বেডের মাঝে সারি করে ২ মিটার দূরে দূরে সবদিকে ৫০ সেন্টিমিটার মাপে গর্তকরে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা তৈরি করে সেখানে সরাসরি দুইটি করে বীজ বুনে দেওয়া যায়।

ফেব্রুয়ারী থেকে মার্চ মাস বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। হেক্টর প্রতি ৩ থেকে ৪ কেজি বা শতক প্রতি ১২ থেকে ১৫ গ্রাম বীজ লাগে। বীজের আঁকারের দ্বিগুণ গভীরে বীজ বপন করা ভাল। পলিব্যাগ থেকে চারা অপসারনের সময় পলিব্যাগে পানি সেচ দিতে হবে। তাহলে চারা অপসারনের সময় চারার শেকড় ভেঙে
বের হবে না বা নষ্ট হবে না। বিকেলবেলা চারা রোপন করতে হবে এতে চারা কম মরে। চারা লাগানর পরে চারার গোঁড়া মাটি দিয়ে টিপে দিতে হবে। এরপর পানি সেচ দিতে হবে।

শসা চাষে সার প্রয়োগ/ব্যবস্থাপনা:
শসার বেশি ফলন ও গাছের বৃদ্ধির জন্য নিয়মমতো সার দিতে হবে। প্রতি মাদায় পচা গোবর, ছাই, পচা কচুরিপানা, জৈব সার
ইত্যাদি মিলিয়ে ৫-৬ কেজি, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ৬০-৭০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করে মাটিতে ভালোমতো মিশিয়ে দিতে হবে। ১৫-২০ দিন পর পর প্রতি মাদায় ৫০ গ্রাম হারে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

শসা চাষে সেচ ও পানি নিষ্কাশন:
শসা পানির প্রতি খুব সংবেদশীল। মাটিতে
রস কম থাকলেই সেচ দেয়া প্রয়োজন। তবে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের পর সেচ দেয়া উত্তম। খেয়াল রাখবেন শসা গাছের মাটি শুকিয়ে গেলে ফুল ঝরে যায় এবং গাছ ঢলে আসে। আবার বর্ষাকালে ক্ষেতে পানি জমে থাকলেও শসার জন্য ক্ষতিকর। বৃষ্টি বেশি হলে সেচ দেয়ার দরকার নেই। কয়েকদিন পানি জমে থাকলেই গাছের গোঁড়া পচে মরে যেতে পারে। সেজন্য নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

শসা চাষে আগাছা ও নিড়ানি:
জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। প্রতিবার ইউরিয়া সার দেয়ার পর আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। গাছ লতানোর জন্য মাচার ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ একটু বড় হলেই মাচা তৈরি করে দিতে হবে। রোগবালাই দমনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখবেন শসা গাছ বিভিন্ন রোগের আশ্রয়দাতা। তাই ক্ষেত সবসম্য আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

শসা চাষে পোকামাকড় ও রোগদমন:
ডাউনি মিলডিউ শসার সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগ। এ রোগ হলে পাতার নিচে প্রথমে জলবসা গোল গোল 
দাগ পড়ে। পরে দাগ গুলো শুকিয়ে বাদামি হয় ও ওপরে উঠে আসে। শেষে পুরো পাতাই শুকিয়ে ফেলে।
এই রোগ হলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। ফলের মাছি কচি শসা নষ্ট করে। ফলের মাছি পোকা নিয়ন্ত্রনের জন্য জমিতে বিষ টোপ বা সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ পাততে হবে। বীজ বপনের ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ শুরু করা যায়। খাওয়ার জন্য কচি থাকতেই সবুজ রঙের শসা তুলতে হবে। হেক্টর প্রতি ১০ থেকে ২০ টন অর্থাৎ শতক প্রতি ৪০ থেকে ৮০ কেজি শসা তোলা যায়।


শসা চাষ, শসার অজানা ব্যবহার, এবং শসার উপকারিতা,
শসার অজানা ব্যবহার:
পুষ্টিকর সবজি হিসেবে শশার চাহিদা তুমুল। সালাদ তৈরিতে, কাঁচা কিংবা রান্না করে- সব রকমভাবেই খাওয়া যায় শসা। রূপচর্চার ক্ষেত্রে শসা ছাড়া প্রায় সবকিছুই অপূর্ণ।

নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধের সমস্যা থাকলে হাতের কাছে মিন্ট না থাকলে কয়েক টুকরা শসা চিবিয়ে খেয়ে ফেলুন। নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ থাকবে না।

একটানা কাজ করলে অনেকের মাথা ব্যথা হয় এই রকম মাথা ব্যথা হলে কয়েক টুকরা শসা খেয়ে ৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুন। মাথা ব্যথা সেরে যাবে।

বাসার আশেপাশে বাগান থাকলে কীটপতঙ্গ অত্যাচার করে। একটা এ্যালুমিনিয়াম কৌটায় কয়েকটুকরা শসা রেখে দিন। এ্যালুমিনিয়ামে শসা এমন এক গন্ধের সৃষ্টি করবে যা কীটপতঙ্গ সহ্য করতে পারে না। কিন্তু মানুষের কোন সমস্যা হয়না।

ছুরি, চাকু বা দায়ের মরিচা দূর করার জন্য
এক টুকরা শসা কেটে নিয়ে ঘষে নিন।
দেখবেন মরিচাতো দূর হবেই, সাথে
ভেসে উঠবে পুরনো ধারের উজ্জ্বলতা।

বাসার ছোট্ট শিশুটি দেয়ালে পেন্সিল দিয়ে হিবিজিবি এঁকে দাগ ফেললে শসার খোসা নিয়ে ক্রেয়নের দাগগুলো মৃদু ঘষে তুলে ফেলুন দেখবেন সহজে উঠে গেছে কলমের কালিও শসার খোসা দিয়ে ঘষে তুলে ফেলা যায়।


শসা চাষ, শসার অজানা ব্যবহার, এবং শসার উপকারিতা
শসার উপকারিতা:
প্রতিদিনের খাবারে সালাদ হিসেবেই শসার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। তবে খাবারের সাথে অনুষঙ্গ হিসেবে শসার কদর বেশি হলেও পুষ্টিগুণের দিক দিয়ে শসা মোটেও পিছিয়ে নেই। শসা গোর্ড পরিবারের কিউকারবিটাসের অন্তর্গত একটি অতি পরিচিত উদ্ভিদ।

শসা এক প্রকারের ফল। লতানো উদ্ভিদে জন্মানো ফলটি লম্বাটে আকৃতির এবং প্রায় ১০-১২ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। এর বাইরের রং সবুজ। তবে পাকলে হলুদ হয়। ভেতরে সাদাটে সবুজ রঙের হয়, এবং মধ্যভাগে বিচি থাকে।

এর উত্পত্তি ভারতবর্ষে হলেও বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই জন্মে। এটি সাধারণত গরমের সময় বেশি পাওয়া যায়।

বেশ কয়েক জাতের শসা রয়েছে। এই ফলে
ক্যালোরির পরিমাণ কম থাকে এবং জলের পরিমাণ বেশি থাকে। খোসাসহ একটি কাঁচা শশা'র প্রতি ১০০ গ্রামে ক্যালোরির পরিমাণ ২০ কিলো ক্যালোরি।
বাংলাদেশে শশা প্রধানত সালাদ হিসেবে ব্যবহূত হয়। শসা যতটাই সাদাসিধে হোক না কেন খাদ্যগুণ বিচারে এটি অনন্য।

পুষ্টি উপাদান: শসা ভিটামিন এবং মিনারেলেস পরিপূর্ণ একটি সবজি। এর ৯৬ শতাংশ পানি। শসা ভিটামিন-কে, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, ফলিক এসিড, পটাশিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজের উত্তম উৎস। এ ছাড়া রিবোফ্লাবিন, প্যান্টোথেনিক এসিড, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, সালফার, সিলিকা এবং ভিটামিন বি-৬ আছে বেশি পরিমাণে। শসা থেকে খাদ্য আঁশ পাওয়া যায়। তবে এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট আর কোলেস্টরলের পরিমাণ খুব কম বলে এটি প্রায় সব ধরনের মানুষের জন্যই দারুণ উপকারী। এতে আরো রয়েছে ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস, কিউকারবিটাকিন্স, লিগনান্স এবং ফ্লাভনয়েডস। এ ছাড়া কম কোলেস্টরল ও কম ফ্যাট-যুক্ত শসা থেকে  বাড়তি ক্যালোরি পাওয়া যায় বলে যারা ওজন কমাতে চান তাদের জন্য শসা সব সময়ই আদর্শ একটি খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। এতে কোনো সম্পৃক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরল নেই।
Previous
Next Post »