Romantic Story Time Now Romance Tale

Romantic Story Time Now Romance Tale
Time Now

সকালটা খুব ব্যস্ত কাটে রেশমীর। বলতে
গেলে নিঃশ্বাস ফেলার সময় পায় না। নাস্তা বারেশমীরনানো, ছেলে মেয়েকে ওঠানো, স্কুলের জন্য রেডি করা, স্বামীকে সবকিছু গুছিয়ে দেওয়া, টিফিন দিয়েে দেয়া সব মিলিয়ে অল্প সময়ে অনেকটা কাজ। একে একে সবাই চলে গেলে স্বস্তি। ধীরে ধীরে নিজের ব্রেকফাস্ট সেরে একটু রেস্ট নিয়ে নেয়। তারপর অন্য কাজ। কয়েকদিন বৃষ্টির পর আজ রোদের দেখা মিলেছে। রেশমী রিমো মিমোর ছোট্ট শিমুল তুলোর বালিশ দুটো নিয়ে বারান্দায় গেল রোদে দিতে। তার ছোট ঝুল বারান্দা। বন্দি ফ্ল্যাটে নিঃশ্বাস নেয়ার একমাত্র জায়গা। রেশমী সেই নিঃশ্বাসকে আরও সতেজ করে তুলতে প্রচুর গাছ লাগিয়েছে। বাগান বিলাস, পাতাবাহার, অর্কিড, ফার্ণ, ক্যাকাটাস, গোলাপ, বেলী আরও কয়েক রকমের গাছ। নিয়ম করে এগুলোর যত্নও নিতে ভোলে না।

বালিশগুলো চেয়ারে রেখে ফিরে আসার সময় রেশমী অবাক হয়ে দেখল তার ঝোলানো টবে একটা ঝকঝকে বেগুনী অর্কিড ফুটেছে।

গতরাতের বৃষ্টির পানির ফোঁটাগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে। রেশমীর ইচ্ছে হলো সে কিশোরদের মতো একটু লাফিয়ে নেয় বা খানিকক্ষণ নেচে গেয়ে খুশিটা প্রকাশ করে! কিন্তু সে বয়স আর নেই। সে অর্কিডটা একবার ছুঁয়ে দেখল। চোখ বন্ধ করে অনুভব করল ফুলের স্পর্শ। ড্রয়ার থেকে ক্যামেরাটা বের করে এনে ছবি তুলল কয়েকটা। আজ বহুদিন পর তার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে! রেশমী বারান্দায় তার রকিং চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করল। খুব ইচ্ছে করছে পুরানো দিনগুলোতে ফিরে যেতে। চোখ বন্ধ করার সাথে সাথেই স্মৃতিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। সেই প্রথম প্রেমের স্মৃতি!

তখন বয়স কত হবে? আঠারো- উনিশ সবে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। আর সব মেয়েদের মতো রেশমীর সাজগোজ, পোশাক-আশাকের প্রতি অতটা ঝোক ছিল না। সাধারণ জামাকাপড় পরে, চুলে কখনো একটা বেনী আবার কখনো হাত খোঁপা করে চলে যেত
ক্লাসে। তার ছিপছিপে লম্বা গড়ন, কালো গায়ের রঙ আর অগোছালো অবস্থার জন্য অনেকেই অনেক কথা বলতো। সে সেসব গায়ে মাখতো না। নিজের মতো থাকতো। তবে মেধাবী হওয়ার সুবাদে কেউ তাকে সামনাসামনি কিছু বলার সুযোগ পায়নি কখনো।

রেশমীর একমাত্র শখ ছিল ফটোগ্রাফি। তার ছোট মামার উপহার দেয়া সাধের ক্যামেরাটা বেশিরভাগ সময়ে হাতে নিয়ে ঘুরতো। যখন যেটা পছন্দ হতো ক্লিক করে ছবি তুলে নিতো। যেখানে তখনকার অধিকাংশ মেয়ে ক্যামেরা ধরেও দেখেনি কখনো। সে বছর ট্যুরে নিয়ে গেল সেন্টমার্টিন। সারা রাস্তা স্যারেরা নিয়মকানুন বোঝাতে বোঝাতে গেলেন। সবার থেকে আলাদা হওয়া যাবে না, সমূদ্রের বেশিদূর পর্যন্ত যাওয়া যাবে না, রাত আটটার মধ্যে হোটেলে ফিরতে হবে ইত্যাদি। তারা পৌঁছুলো বিকেলে। হোটেলের অবস্থা খুবই খারাপ। 

ছোট ঘর। এক ঘরে গাদাগাদি করে পনেরো জন থাকতে হবে। একটা বাথরুম তাও নোংরা। রেশমীর সব দেখে সেখানে বসে থাকতে ইচ্ছে হলো না। সে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে রওনা হলো সৈকতের দিকে। দ্বীপের কত রঙ, কত বৈচিত্র্য! সন্ধ্যায় প্রতি মুহূর্তে আকাশের রঙ বদলায়। সাথে পাল্লা দিয়ে বদলায় সমূদ্রের রঙ। রেশমী মন ভরে দেখার সাথে সাথে ক্যামেরা ভর্তি করতে শুরু করল। সূর্য ডোবার পর রাতের আকাশে দেখা গেল তারার মেলা। একটা দুটো করে পুরো আকাশ ভরে গেল। সমুদ্রের পাড়ে সতেজ বাতাস প্রাণভরে উপভোগ করল। রাত কয়টা বাজে তার খেয়াল রইল না। সাথে ঘড়ি নেই। হোটেলে ফেরার কথা মনে পড়ল প্রচন্ড ক্ষুধা লাগায়। রেশমী চুপি চুপি হোটেলে গেল। কাউন্টারে উপর দেয়ালে লাগানো ঘড়ির ঘন্টার কাটা তখন এগারোটা ছুঁই ছুঁই। স্যারদের চোখ বাঁচিয়ে রুমের দিকে রওনা হতেই পথ আগলে দাঁড়াল একটা ছেলে। ছেলেটা রেশমীর এক বছরের সিনিয়র। নাম সজীব। বেশ প্রভাব আছে তার ডিপার্টমেন্টে। রেশমী সজীবকে ভালোভাবে চিনলেও কথা হয়নি কখনো। সজীব রেশমীর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে কোমরে হাত
দিয়ে বলল, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
স্যারেরা আমাকে খুঁজেছিল?
প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন করতে হয়? শুনেছিলাম তুমি ভদ্রতার ধার ধারো না। এখন প্রমাণ পেয়ে গেলাম। রেশমী অপমানিত বোধ করলেও কিছু বলল না। সজীব বলল, ছবি তুলেছ সাগরের?
হ্যাঁ। দেখাও তো! রেশমী তোলা ছবিগুলো দেখাল। সজীব অবাক হয়ে বলল, এখন সাগর এত সুন্দর লাগছে? হ্যাঁ। সজীব একটা ছবি দেখিয়ে বলল, এটা কোথায়?
এখান থেকে সোজা দক্ষিণে।
আমাকে নিয়ে যাবে সেখানে।
আচ্ছা কাল সকালে নিয়ে যাব।
সকালে না এক্ষুনি। নইলে স্যারদের বলে
দেব তুমি এতক্ষণ বাইরে ছিলে।


রেশমী একবার ভাবল বলবে, যা খুশি করুন। আই ডোন্ট কেয়ার। কিন্তু বলল না৷ তার নিজেরও আবার যেতে ইচ্ছে হলো খোলা সমূদ্রে। কিন্তু তার যে বড্ড ক্ষুধা লেগেছে! সজীবকে সেকথা বলতেই সে বলল, খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সত্যি যাওয়ার আগে সজীব খাওয়ার ব্যবস্থা করল। পেটভরে খেয়ে বীচে গেল দুজন। দূরে একটা দুটো মানুষ দেখা যায়। চিকন চাঁদটা জ্বলছে। তার সঙ্গী হাজারো তারা। এমন দৃশ্যে কার না মন গলে? সজীব বালিতে শুয়ে পড়ল সোজা হয়ে। রেশমী তার পাশে বসেছে। প্রথম সজীব সহজ হয়ে গল্প করতে শুরু করল। ছেলেটা কতটা প্রাণবন্ত বুঝে গেল রেশমী। স্বল্পভাষী রেশমী খুব একটা কথা বলতে না পারলেও মুগ্ধ হয়ে শুনে গেল সজীবের কথাগুলো। এক পর্যায়ে সজীব বলল, শুয়ে পড়ো রেশমী। শুয়ে শুয়ে আকাশটা দেখতে আরও অনেক ভালো লাগে।

রেশমী যেন অপেক্ষাই করছিল এর জন্য। সজীবের থেকে খানিকটা দূরে শুয়ে পড়ল।
রাত গভীর হলো, গল্পও বাড়ল। একটা সময় দুজনেরই মনে হলো এবার ফেরা প্রয়োজন।
সেদিন কিছুটা অজান্তে, কিছুটা জেনেশুনে মনের বিনিময় হয়ে গিয়েছিল। ফেরার সময় দুজনেই ভাবছিলো আর কখনো আসা হবে
এভাবে? একসাথে? পরের দিনগুলো কেটে গিয়েছে স্বপ্নের মতো। আর ভীষণ দ্রুত!

ট্রেনের মতো? নাহ্ রকেটের মতো! ভালোলাগা থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে, একসাথে কঠিন সময়ে পথচলা, জমজ বাচ্চা সব যেন চোখের নিমিষে হয়ে গেল! সজীব তাকে প্রপোজ করেছিল প্রায় এক বছর পর। গান গেয়ে, হাঁটু গেড়ে বেগুনী রঙের অর্কিড দিয়ে তাকে বলেছিল, ভালোবাসি রেশমী।

রেশমী উত্তর দিতে পারেনি সেদিন। কথা হয়ে গিয়েছিল চোখে চোখে। মুখ ফুটে বলার প্রয়োজন আছে কি? যখন চোখদুটো পুরো মনের প্রতিচ্ছবি এঁকে দেয়? রেশমী পরে জিজ্ঞেস করেছিল, অর্কিড কেন? সজীব হেসে উত্তর দিয়েছিল, সবাই গোলাপ দিয়ে প্রপোজ করে। আমি নাহয় অন্য কিছু দিয়ে করলাম।

সেদিন বন্ধুদের হৈ-হুল্লোড় আর উত্তেজনায় ফুলটা হারিয়ে গিয়েছিল রেশমীর কাছ থেকে। সে কি মন খারাপ হয়েছিল তার। মনে মনে ভেবে রেখেছিল নিজে এরকম অর্কিড গাছ লাগাবে। প্রথম ফোটা ফুলটা দিয়ে উত্তর দেবে সজীবকে। সেই অর্কিড আর ফোটেনি তার বাগানে। সাদা, হলুদ, গোলাপী কত রঙের হলেও বেগুনী রঙের ফুল যেন অভিমান করেই তার কাছে ধরা দেয়নি। রেশমী চোখ খুলে অর্কিডের দিকে তাকাল। হাসি ফুটলো চোখেমুখে। সন্ধ্যায় ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রেশমী যত্ন করে খিচুড়ি রান্না করেছে। রিমো মিমো পড়াশুনা করছে না। টিভির রিমোট নিয়ে মারামারি করছে। মায়ের সাধের ড্রইং রুমের অবস্থা দেখার মতো হয়েছে। কিন্তু মা আজ কিছুই বলছে না। দুজনেই এবার ঝগড়া থামিয়ে মায়ের দিকে মনোযোগ দিল। বুঝতে পারল তাদের মা কোনো বিশেষ কারণে খুশি। তাদের আজ ঈদের দিন। যাই করুক, মা কিছু বলবে না। একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে তারা আবার ফিরে গেল আগের ঝগড়ায়। সজীব বাসায় ফিরল দশটায়। ক্লান্ত শরীর। আধভেজা। রেশমী তোয়ালে এনে মাথা মুছে দিল ভালো করে। সজীব মুচকি হেসে
বলল, আজ জনাবা খুশি মনে হচ্ছে?

রেশমী কপট রাগ দেখিয়ে বলে, আমি বুঝি এমনিতে তোমার যত্ন করি না? তা তো করোই। সেজন্য না। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখতে পাচ্ছি যে! কোনো সুখবর নাকি? রেশমী একটু লজ্জা পেয়ে বলল, না এমনি। আবার দুটো জোড়া বাচ্চা হলে এই ফ্ল্যাটে জায়গা হবে না রেশমী সজীবকে ধাক্কা দিয়ে বলল, যাও তো! ওসব কিছু না! তাহলে কী? রাতে জানতে পারবে।
শুতে যাওয়ার আগে রেশমী ফুলটা ছিঁড়ে নিয়ে এল। সজীব দেখে বেশ খানিকটা অবাক হয়ে বলল, তোমার গাছের ফুল কাউকে ধরতেও দাও না। আজ নিজে ছিঁড়েছ?

হুম। রেশমী ফুলটা হাতে সজীবের সামনে দাঁড়াল। এভাবে কি বলা যায়? এত বছর পর? উচ্ছল ভালোবাসাগুলো কবে সংসারের
দায়িত্বের সাথে মিশে গেছে! এখন কি আর সেই দিন আছে? রেশমী অনেক চেষ্টা করেও বলতে পারল না কিছু। সজীব রেশমীর দুই গালে হাত দিয়ে বলল, বলতে হবে না কিছু্। জানি সব। তোমার এতদিনের সাধের ফুলটা আজ ফুটেছে। তবে সে বড্ড দেরি করেছে যে! ভালোবাসার কথা কি এখনো অজানা রয়েছে? সেই কথাগুলো তো আমি হৃদয় দিয়ে প্রতিদিন প্রতিবেলায় শুনি। গলার স্বরের চেয়ে মনের স্বর অনেক বেশি মধুর! রেশমী চোখ তুলে তাকাল। সজীবের বুকে কী যেন শেলের মতো গিয়ে বিঁধল। এটাই বুঝি ভালোবাসা? রেশমীর গভীর ছলছল চোখদুটো যেন খোলা উপন্যাস। হাজার বছর পড়েও শেষ করা যাবে না।
(সমাপ্তি)
Previous
Next Post »