জ্যোৎস্না রাতের গল্প গুলো

জ্যোৎস্না রাতের গল্প গুলো
জ্যোৎস্না রাতের গল্পের

পুকুরের পাশে বিরাট পেয়ারা গাছ। গাছের একটা মোটা ডাল
বেঁকে পুকুরের উপর দিয়ে শাখাপ্রশাখা মেলে দিয়েছে। শিউলি
সেই ডালে বসে একটা কাঁচা পেয়ারায় কামড় দিয়ে সেটা ছুড়ে
ফেলল পানিতে। দূরে সেটা পানিকে আলোড়িত করে দিয়ে ডুবে
গেল। শিউলি আপনমনে খিলখিল করে হেসে উঠল। মুশফিক ভাই এখন
থাকলে তাকে তরঙ্গ বোঝানোর চেষ্টা করতো। এই ছেলের একটাই
সমস্যা। যা শেখে তাই শিউলিকে শেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু
শিউলি যে কিছুই বুঝতে পারছে না সেটা নিজে বোঝে না।
আরও দুটো পেয়ারার ঢিল ছুড়ে সে নেমে পড়ল গাছ থেকে।
ক্ষেতের মাঝ দিয়ে বাড়ির পথ ধরল। সকাল বেলাটায় সে মাঝে
মাঝেই হেঁটে অনেকদূর চলে যায়। সরিষা ফুলে হলুদ হয়ে আছে
দিগন্ত পর্যন্ত। মাঝে মাঝে অন্য সবজির ক্ষেতও আছে। বিস্তর
জমির একপাশে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বালু ফেলা হয়েছে
কিছুদিন আগে। শুনেছে সেখানে বিরাট বাড়ি হবে। সেই বাড়ি
ছাপিয়ে এই ফসলের সৌন্দর্য পুরোটা আর একসাথে দেখা যাবে
না, ভাবলেই শিউলির দমবন্ধ হয়ে আসে। সে চোখ ফিরিয়ে চলে
যায় সেখান থেকে।
খানিকটা নাচের তালে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ি পাশ দিয়ে
যাওয়ার সময় ভাপা পিঠার ঘ্রাণ ভেসে আসে। শিউলির জিভে জল
চলে আসে। কতদিন খায়নি! মা'কে কি বলবে একবার পিঠে
বানাতে? কত কী লাগে তো! এতকিছু মা কোথায় পাবে?
শিউলি বাড়ি ফিরে দেখে মা খাচ্ছে। ভাতের সাথে কুমড়ো পাতার
ভর্তা। তার পাত বেড়ে রাখা হয়েছে। শিউলি মুখটা গোমড়া করে
বসে বলে, এই দিয়ে আমি খেতে পারব না।
মা কিছু না বলে উঠে যায়। শিউলি মুখ নিচু করে ভাতের প্লেটে
আঁকিবুঁকি করতে থাকে। একটু পর বড় একটা ডিমভাজা এনে শিউলির
প্লেটে দেয় সুফিয়া বেগম। শিউলির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে
মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ডিম পাইলা কই??
-- আজকা অনেকগুলা ডিম হইছিলো। ওইখান থেকা রাখছি।
শিউলি তৃপ্তিসহ খেয়ে নেয় ভাতটুকু। ইচ্ছে হয় আরও একটু খেতে।
কিন্তু ভাত শেষ। খাওয়া হলে একটা কথা মনে হতেই মায়ের দিকে
তাকায় সে। বলে, তুমি একটু ডিম খাইলা না মা?
ব্যস্ত ভঙ্গিতে সুফিয়া বলে, আমি ডিম খাইতে পারি না জানোছ
না?
শিউলি বলে, ওহ। ভাবে না কিছু আর। উঠে চলে যায় বাইরে। তাদের
ছোট্ট উঠানের একপাশে মা যতটুকু পারে সবজি গাছ লাগিয়েছে।
সেখান থেকে লাউ ছিঁড়ে আনা হয়েছে আজ রান্নার জন্য। শিউলি
ভাবে, কয়েকটা ছোট মাছ দিয়ে লাউটা রান্না করলে বেশ হতো!
শিউলিদের বাড়ির পেছনে বিরাট বাঁশঝাড়। তার পেছনে নামার
পানিতে মাছ আছে। শীতের দিনে পানি অনেক কম। মাটির বেড়
দিয়ে ইচ্ছে করলেই মাছ মারা যাবে। এদিকে যদিও তেমন কেউ
আসে না। তবু শিউলি গিয়ে দেখে একবার। না, কেউ নেই। এবার
মুশফিক ভাইকে ডেকে আনবে।
মুশফিক পড়ছে। তার মাথায় তড়িৎ রসায়নের চ্যাপ্টারটা কিছুতেই
ঢুকছে না। অথচ কাল পরীক্ষা। আগে এই অধ্যায় ভালো করে ধরা
হয়নি। ভেবেছিলো সহজ। নয়তো কারো থেকে বুঝে নেয়া যেতো।
ক্লাসে স্যাররা যত্ন করে পড়ায় না। প্রাইভেটে যেতে হয় পড়া
বুঝতে। মুশফিকের অত সামর্থ্য নেই। শুধু পদার্থবিজ্ঞানটা প্রাইভেট
পড়ছে কষ্ট করে হলেও।
একটা অংক মেলানোর চেষ্টা করছিলো সে। এই সময় জানালায়
শব্দ হলো। ফিরে তাকিয়ে দেখল শিউলি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
শিউলি বলল, মুশফিক ভাই, মাছ মারবা? চলো না যাই।
মুশফিক বিরক্ত গলায় বলে, আমার পরীক্ষা। যা তো তুই।
-- একটু গেলে কী হয়?
-- ওই একটু সময়ে আমার অনেকখানি পড়া হইব।
-- তাইলে রাতে বাইর হইবা না আজকা?
-- নাহ।
শিউলি আর কথা বাড়ায় না। ভেঙচি কেটে চলে যায় সেখান
থেকে। রাস্তায় দেখা হয় মুশফিকের ছোট ভাই মিলনের সাথে।
মিলন শিউলিকে খুব পছন্দ করে। দেখেই বলল, শিউলি আপা, ওই
গেরামে মেলা বইছে। অনেক কিছু পাওয়া যাইতাছে।
শিউলির আগ্রহ হয় না। মেলায় যেতে টাকা লাগে। মিলন মেলায়
কী পাওয়া যায়, কী কী খেলা আছে সেসব বলতে থাকে। শিউলির
কানে যায় না সেসব। তার চোখ দূরে বড় শিমুল গাছটার দিকে।
সেটার ডালে একটা ঘুড়ি আটকে আছে। সে মিলনকে কথার
মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বলে, ঘুড়ি উড়াবি মিলন? অনেকদিন
উড়াই না।
মিলন রাজি হয়। বিকেলে দুজনে মিলে পলিথিন, বাঁশের কঞ্চি,
আঠা দিয়ে চমৎকার দুটো ঘুড়ি বানিয়ে ফেলল। সুতা, লাটাইও তৈরি
হলো। এবার মাঠের কাছে গিয়ে ঘুড়ি উড়ালো দুজন। দেখতে দেখতে
আরও কিছু বাচ্চা জড়ো হয়ে গেল। কয়েকজন ঘুড়ি এনে উড়িয়ে দিল
ওদের পাশে। আকাশে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ানো ঘুড়িগুলো
দেখে শিউলির কি যে ভালো লাগলো! এবার ঘুড়ি নিয়ে পাল্লা
শুরু হলো। চরম উত্তেজনা চলছে। শিউলি প্রায় একজনের সুতো
কেটেই ফেলছিলো সেই সময় শক্ত দুটো হাত তাকে টেনে নিয়ে
গেল। বাচ্চাগুলো হা হয়ে তাকিয়ে রইল। মিলন ছুটে পালালো।
একটা বড় গাছের আড়ালে নিয়ে শিউলির হাত ছাড়লো মুশফিক।
শিউলি বিরক্ত মুখে বলল, কী হইছে?
-- এত বড় মাইয়া এমনে লাফালাফি কইরা ঘুড়ি উড়ায়? মাইনষে
চাইয়া থাকে না?
-- কী?
শিউলি বুঝতে পারে না মুশফিকের কথা।
-- তোর বুঝা লাগবো না। তুই বাড়ি যা।
-- আমি ঘুড়ি উড়ামু।
আবদারের সুরে বলে শিউলি।
মুশফিক কড়া গলায় বলে, বাড়ি যাইতে কইছি, যাবি। এত কথা
কিসের?
শিউলি মাথা নিচু করে রাখে। তার চোখে পানি চলে এসেছে।
মুশফিক বুঝতে পেরে শিউলির মুখটা দুই হাতে তুলে বলল, তোর
ভালার লাইগাই কইতাছি।
-- কী ভালা?
-- তুই ছোট এখনো? তোর সমান কাউরে দেখছোছ ঘুড়ি উড়াইতে?
শিউলি নিজের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নেয়। তারপর
বলে, না।
মুশফিক হেসে ফেলে কান্ড দেখে। বলে, যা এখন। রাতে থাকিস।
বের হমু।
-- তোমার না পরীক্ষা?
-- সমস্যা নাই, পড়া অনেকখানি শেষ।
শিউলি খুশি হয়ে বলে, আচ্ছা।
শিউলি বাড়ি ফিরে দেখে মা কাঁথা সেলাই করছে। শিউলিকে
দেখে সুফিয়া বলে ওঠে, ঢিঙ্গি মাইয়া সারাদিন কই ঘুইরা বেড়াছ?
আমার লগে একটু কাম করতে তো পারোছ। আমি সারাদিন খাইটা
মরি...
অন্যদিন হলে শিউলি কথা গায়েই লাগাতো না। আজ কী হলো, সে
সুঁইয়ে সুতো গেঁথে সেলাই করতে বসে গেল। সন্ধ্যা মিলবার আগ
পর্যন্ত একটানা সেলাই করে গেল। সুফিয়া অবাকই হলো বেশ।
রাতে গ্রামটা তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে যায়। এশার আজানের পর
খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে সব। মা বাবা সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত
থাকে। একবার ঘুমোলে সহজে সে ঘুম আর ভাঙে না। শিউলি মায়ের
পাশে শোয়। রাত বাড়লে মায়ের নিঃশ্বাস যখন ভারী হয়ে আসে,
তখন সে ঘর খুলে চুপিচুপি বের হয়ে আসে।
গ্রামের প্রান্তে বিরাট মাঠ। মাঠের একপাশে ক্ষেত, অন্যপাশে
লম্বা লম্বা ঘাস। প্রতি পূর্নিমার আগে পরের দিনগুলোতে
মুশফিকের সাথে শিউলি সেই চাঁদের আলো দেখতে আসে।
জ্যেৎস্নায় ভেসে যাওয়া বিস্তৃত মাঠটা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।
মুশফিক অনেক গল্প করে। কখনো শুকতারার গল্প, সপ্তর্ষীমন্ডলের
গল্প, কখনো বা গ্রীক রূপকথারর গল্প। শিউলি বেশিরভাগই শোনে
না। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে মুশফিকের দিকে। গল্প বলার সময়
মুশফিকের ভাবভঙ্গি অন্যরকম লাগে। বেশ দেখায় তাকে!
আজ অনেকটা সময় থাকার পর মুশফিক বলল, চল যাই। কাল সকাল
সকাল উঠতে হবে।
শিউলি বলল, ইন্টার শেষ হইলে কি তোমার পড়ালেখা শেষ?
-- আরে না পাগল। আরও অনেক পড়া বাকি। আমার তো শখ ঢাকা
যাইয়া পড়ালেখা করুম।
শিউলির মুখে মুহূর্তেই বিষন্নতার ছায়া পড়ে। সে মুখ গোমড়া করে
বলে, তুমি চইলা যাইবা? তাইলে আমারে গল্প কইব কে? আমার কথা
শুনবো কে?
মুশফিক শিউলির মাথায় টোকা দিয়ে বলে, আমি কি সারাজীবনের
লাইগা যাইতাছি নাকি? পড়া শেষ হইলেই আইসা পড়ুম।
ফেরার পথে বিরাট তেঁতুল গাছটা পড়ে। শিউলির বড্ড ভয় করে
জায়গাটা পার হতে। সে সরে এসে মুশফিকের হাতটা ধরে ফেলে।
মুশফিকের মাথায় তখন রাজ্যের চিন্তারা ঘুরপাক খাচ্ছে। আচমকা
শিউলি তার হাত ধরাতে চমকে তাকায় শিউলির দিকে। শিউলির
মুখের একটা পাশ আলোকিত, অন্যপাশে গাছের ছায়া। কি অপূর্ব
দেখাচ্ছে তাকে!
মুশফিক আগাগোড়া না ভেবেই হুট করে শিউলিকে জড়িয়ে ধরল
শক্ত করে। শিউলির চুল থেকে বেলীফুলের ঘ্রাণ আসছে। মুশফিকরে
মনের কোথাও যেন বীনার সুর বেজে চলেছে একনাগাড়ে।
শিউলি প্রথমটায় বুঝতেই পারলো না ব্যাপারটা কী হলো। ধাতস্থ
হতেই সে নিজেকে মুশফিকের বাহুডোরে বন্দি পেল। কেমন অজানা
শিহরন বয়ে গেল সারা শরীরে। মনে হলো শরীরের রক্তগুলো তীব্র
বেগে ছুটতে শুরু করেছে। কিন্তু মনের কোথাও ভীষণ অস্বস্তি লাগা
শুরু হলো। সে ঠেলে সরিয়ে দিল মুশফিককে।
মুশফিক অপরাধীর দৃষ্টিতে শিউলির দিকে তাকালো। দুজনের
কেউই বুঝতে পারলো না গত কয়েক মিনিটে কী হয়ে গেল! বাকি
পথটা কেউ কারো সাথে কথা বলল না।
পরদিন দুপুরে শিউলি গোসল করে এসে দেখল মা রুটি বানাচ্ছে।
শিউলির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বলল, এইবেলায় এইগুলা কেন?
সুফিয়া মৃদু স্বরে বলল, চাইল নাই। তোর বাপেরে কইছিলাম আইনা
দিয়া যাইতে, দেয় নাই। রাইতে চাইল আনলে ভাত রানতে পারুম।
শিউলি আর কথা না বাড়িয়ে রুটি খেতে বসে গেল। তার মা রুটি
বানাতে পারে না। মোটা মোটা হয়। তার উপর আটাও ভালো না।
শিউলি খেতে পারে না। তবু কষ্ট করে গিলতে থাকে। সুফিয়া
অবাক হয়। সে জানতো শিউলি রাজি হবে না এসব খেতে। ঘরে
কয়েকটা ক্ষুদ ছিল। ভেবেছিল সেগুলা তাকে রেঁধে দেবে।
শিউলি খাওয়া শেষ করে উঠে ঘরে গিয়ে শুয়ে রইল। ভাবভঙ্গি
ভালো লাগলো না সুফিয়ার।তার বড় ভয় হয় এই মেয়েকে নিয়ে।
মেয়েটা কিছু বোঝে না যে! ওর বিয়েটা হলে তার শান্তি হয়। এই
বিয়ের কথা ভেবে শিউলির জন্মের পর থেকে সুফিয়া ডিম বেঁচে,
বাড়িতে লাগানো সবজি বেঁচে, কাঁথা সেলাই করে টাকা
জমিয়েছে। কখনো বা স্বামীর অগোচরে সংসারের খরচ থেকেও
কিছু তুলে রেখেছে। সেই টাকা সব জমা আছে। যত অভাবেই পড়ুক
না কেন সে টাকায় হাত দেয়নি কোনোদিন। তাই দিয়ে মেয়ে পার
করতে হবে যে!
মুশফিক শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে এসে শিউলির খোঁজে গেল।
তার সাথে দেখা হয় না কিছুদিন। সেদিনের ঘটনার জন্য মুশফিকের
ভারি লজ্জা হয়। শিউলির কাছে কীভাবে সেজন্য ক্ষমা চাইবে সে
কথাও অনেকবার মনে মনে আউড়ে নিয়েছে সে। শিউলির বাড়ির
কাছাকাছি গিয়ে কিছু লোককে বের হতে দেখে সেখান থেকে।
জানতে পারে তারা শিউলিকে দেখতে এসেছিল।
শিউলির সাথে সেদিন বিকেলে মুশফিকের কথা হলো। মিলনকে
দিয়ে শিউলিকে ডাকিয়ে এনেছে মুশফিক। গ্রামের পশ্চিম ধারে
জংলা মতো জায়গাটায় লোকজন কম থাকে। শিউলি এসে দেখল
মুশফিক হাতে একটা চিকন ডাল নিয়ে মাটিতে কী যেন লিখছে।
শিউলি কাছে গিয়ে দেখল তার নাম লেখা। সে গম্ভীর গলায় বলল,
তুমি এইসব কী শুরু করলা কও তো?
মুশফিক শিউলির দিকে মুখ তুলে তাকায়। শিউলির মুখটা ভার।
চোখের মোটা করে লাগানো কাজল লেপ্টে আছে। মুশফিক বলে,
বিয়া কইরা ফেলবি তুই?
শিউলি জবাব পায় না। সে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু তার সমান
সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। সে এতদিন মানা করে এসেছে। এখন তার
উপায় নেই।
মুশফিক বলে, তুই সেদিন রাগ করছিলি?
-- কবে?
-- ওইযে রাতে..
শিউলি লজ্জা পায়। তার গাল লাল হয়ে ওঠে। নিচের দিকে
তাকিয়ে বলে, না।
-- তাইলে?
-- কিছু না।
মুশফিক আচমকা বলে, তুই বিয়া করিছ না শিউলি। আমি কাজকাম
শুরু করি, তারপর তোরে বিয়া করুম।
শিউলি ভীষণ অবাক হয়। গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে তার। লজ্জায়
মাথা তুলতে পারে না। এ কেমন কথা! এমন করে কেউ বলে?
অনেকক্ষণ নিরব থাকে দুজন। একসময় শিউলি মৃদু স্বরে বলে, আমি
যাই।
এতদিন ভাসা ভাসা কথা হলেও একদিন শিউলির বিয়ে ঠিক হয়ে
যায়। ছেলে বাইন্ডিং এর কাজ করে। পরহেজগার, ভালো ঘরের।
বাড়ি মানিকগঞ্জ। সবাই খুশি হয়ে রাজি হয়। সেদিনই মুশফিকের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট হয়। সে মেরিট
লিস্টে আছে। মুশফিক একসাথে একটা আনন্দের, আরেকটা দুঃখের
সংবাদ পায়।
এতদিন কথা হয়ে আসলেও বিয়ে না হওয়াতে মুশফিকের একটা
ভরসা ছিল। আজ তার ভেতরটা ভেঙেচুরে আসে। জ্বর জ্বর লাগে।
মুখ তেঁতো হয়ে আসে। দুপুরে খাবার সময় ভাত ফেলে উঠে যায়।
মুশফিকের মা মেহেরিন ভারি অবাক হয়। ছেলে খুশি হওয়ার বদলে
যেন শোক পেয়েছে! সে মুশফিকের ঘরে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে
বলে, কী হইছে বাবা? গেরাম ছাইড়া যাওন লাগব বইলা মন খারাপ?
মুশফিক হ্যাঁ সূচক নাথা নাড়ে। আর কী-বা বলবে! মেহেরিন
ছেলেকে খানিকক্ষণ বুঝিয়ে নিজের কাজে চলে যায়।
অনেক রাতে মুশফিকের ঘরের দরজায় কড়া নড়ে ওঠে। কেউ ধাক্কা
দিচ্ছে জোরে। মুশফিক দরজা খুলে দেখে শিউলি। এর মাঝে শব্দ
শুনে মেহেরিনও উঠে গেছে। তিনি বলে ওঠে, কে রে..?
মুশফিক দ্রুত শিউলির হাত ধরে টেনে তার ঘরে ঢুকিয়ে বলে, মা
আমি।
মেহেরিন আর শব্দ করে না।
মুশফিক দরজা লাগিয়ে দেখে শিউলি ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। সে
হা হয়ে তাকিয়ে থাকে শুধু। শিউলি কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ
মুশফিককে জড়িয়ে ধরে। এবার সেদিনের বিপরীত হয়। মুশফিক
অস্বস্তিতে ছাড়িয়ে নেয় শিউলিকে। শিউলি কেঁদে বলে, মুশফিক
ভাই, আমারে নিয়া যাও তোমার লগে।
-- আমার লগে তোরে কই নিমু?
-- ঢাকায়৷ আমি অন্য কাউরে বিয়া করুম না। মইরা যামু।
মুশফিক কী বলবে ভেবে পায় না। শিউলির চোখদুটো মুছে দিয়ে
বলে, তুই বাড়ি যা। এমনে হয় না।
শিউলি বলে, সত্যি নিবা না? তুমি আমারে ভালোবাসো না?
মুশফিক অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। শিউলি বলে, আমার দিক
ফিরো। কোনোদিন ভালোবাসা না থাকলে ওইদিন বিয়া করবা
কইছিলা কেন?
মুশফিক এবারও জবাব দেয় না।
শিউলির চাহনি বলে দেয় সে কতটা আশাভঙ্গ হয়েছে। সামনের
অপরাধী ছেলেটার প্রতি ক্ষোভে ভেতটা ফেটে যাচ্ছে তার। সে
চোখ মুছে বাড়ির দিকে চলে যায়।
মুশফিকের মাথা ধরে চৌকিতে বসে পড়ল। যন্ত্রণায় কলিজা ছিঁেড়
যাচ্ছে যেন। সে কেন সেদিন বলতে গেল বিয়ের কথা? শিউলি
নাহয় অবুঝ, সে তো নয়। শিউলিকে বিয়ে করার কোনো উপায় নেই
এখন। পালিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু তার বিধবা মা তাকে রক্ত পানি
করে বড় করছেন, মাকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে নাই। মুখ ফসকে
বলে ফেলা কথাটার জন্য বেচারি মেয়েটা এখন কষ্ট পাচ্ছে।
***
মুশফিক কলেজ থেকে বের হয়ে সোজা রাস্তার পাশের চায়ের
দোকানের দিকে গেল। এখানের চা'টা দারুণ হয়। ঘন দুধের সাথে
কড়া লিকার।এসময় ভিড়ও কম থাকে। পেছন থেকে কার ডাক শুনে
সে দাঁড়ালো। দেখল অনন্যা আসছে। অনন্যা তার কলিগ। মুশফিক
ফিজিক্সের টিচার, অনন্যা ভূগোলের। অনন্যা এসে বলল, কোথায়
যাচ্ছেন?
-- চা খেতে।
-- আমি যেতে পারি সাথে? কখনো টং দোকানে চা খাওয়া হয়নি।
-- অবশ্যই।
চা খেতে খেতে গল্প হয়। অনন্যা মিশুক ধরনের। আড্ডা জমিয়ে
ফেলতে পারে। গরম চায়ের বাষ্পে অনন্যার চশমার কাচ ঘোলা হয়ে
আসলো। সে চশমা খুলে নিলো চোখ থেকে। মুশফিক দেখল অনন্যার
চোখজোড়া ভারি সুন্দর। বড় বড় পাপড়ি, যেন কাজল টানা চোখ।
শিউলির চোখগুলো এমন ছিল না। ভাসা ভাসা ছিল। মুশফিক গ্রাম
থেকে আসার পর যত মেয়ে দেখেছে সবার সাথে শিউলির তুলনা
চলে এসেছে তার মনে। কেন আসে সে বুঝতে পারে না।
মোহাম্মদপুরে তিনরুমের একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে মুশফিক। মা
ভাইকে নিয়ে এসেছে গ্রাম থেকে। সময় তার ভালোই যাচ্ছে।
ভাবছে ফ্ল্যাট কিনবে একটা। তার সংসার খরচ হয় কম। সারাজীবন
হিসেব করে চলা মা হুট করে শহরের জীবনে মানিয়ে নিতে পারে
না। ঢাকায় আসার পর প্রথম মাসে মুশফিক যখন মায়ের হাতে বিশ
হাজার টাকা তুলে দেয় তখন মেহেরিন একবার হাতে নিয়েই টাকা
ফিরিয়ে দেয় ছেলের হাতে। বলে, আমি এত টাকা রাখবার পারুম
না। তুই রাখ।
মুশফিক হাসে। ভাইটা কলেজে পড়ছে। কলেজের ছাত্রছাত্রী
পড়াতে তার ভীষণ ভালো লাগে।
শুধু মা প্রতিদিন বিয়ের কথা বলে। মুশফিকের ভালো লাগে না।
বিয়ের কথা ভাবলে সেই রাতের শিউলির মুখটা ভেসে আসে। তার
ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়।
কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের সব দায়িত্ব পড়ল মুশফিকের।
সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে অনুষ্ঠানের আনন্দ সে বুঝতেও পারলো
না। কালচারাল প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার পর সবাই যখন একজায়গায়
জড়ো হলো, মুশফিকের একটু হাফ ছাড়ার সময় হলো। চেয়ারে গা
এলিয়ে বসতেই তার কানে অনন্যার গানের সুর ভেসে এলো।
'পুরানো সেই দিনের কথা' গানটি গাইছে। অনন্যার রিনরিনে গলার
গান শুনতে কি দারুণ লাগছে!
"আয় আরেকটি বার আয়রে সখা
প্রাণের মাঝে আয়...
মোরা সুখের দুঃখের কথা কব
প্রাণ জুড়াবে তায়..."
মুশফিকের মনে হলো কথাগুলো তো তার জন্য লেখা। বড় ইচ্ছে হয়
শিউলিকে দেখতে। আগের মতো রাত জেগে জ্যেৎস্নায় স্নান করে
গল্প করতে। সেদিন রাতের পর শিউলির সাথে তার একবারের জন্যও
দেখা হয়নি।
একটা কাজে শাহবাগ যেতে হবে মুশফিকের। গাড়ি কম রাস্তায়।
ভিড় প্রচন্ড। কোনোরকমে সে ঠেলেঠুলে বাসে উঠে পড়ল।
হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে দাঁড়িয়ে রইল কোনোরকমে। বাস চলতে চলতে
একসময় দীর্ঘ জ্যামে আটকে গেল। সে সময় মুশফিলের চোখে পড়ল
তার ঠিক সামনেই একটা মহিলার ওপর। এটা শিউলি না? সে ভালো
করে তাকায়।
হ্যাঁ, শিউলি। নিশ্চিত হয় মুশফিক। বুকটা কেমন করে ওঠে তার!
শিউলির পরনে পুরানো বোরকা। মাথায় ওড়নাটা কোনোরকমে
আটকানো। মুখে প্রসাধনী নেই। চোখের নিচটা কালো হয়ে আছে।
চোখদুটিতে আগের চঞ্চলতার লেশমাত্রও নেই। কেমন ঠান্ডা হয়ে
আছে মেয়েটা। মুশফিকের দম আটকে আসে যেন। শিউলির পাশে
তার বর। শুকনোমতো এক লোক। মুখে দাড়ি। শিউলির কোলে বছর
দুয়েকের এক ছেলে ঘুমিয়ে আছে। তার স্বামীর কোলে পাঁচ-ছয়
বছরের মেয়ে। মেয়েটা যেন শিউলির প্রতিচ্ছবি। চোখ বড় বড় করে
সব দেখছে। বার বার বাবাকে প্রশ্ন করে বিরক্ত করে যাচ্ছে।
বেশ অনেকক্ষণ বাস এক জায়গায় স্থির আছে। শিউলি বোধহয় অসহ্য
হয়েই এবার নড়ে বসলো। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, আর কতক্ষণ
একখানে দাঁড়ায় থাকব এই গাড়ি? আমরা যামু কখন?
লোকটা হেসে বলল, বউ, ঢাকা শহরের জ্যামের আর কী দেখছ!
এইডা তো কিছুই না।
শিউলি ভুরু কুঁচকে ফেলল। ছোট্ট মেয়েটা বলল, আব্বা আর কতদূরে
জাদুঘর?
-- আরও মেলা দূর। তুমি ঘুমাও তো। সকালে ঘুম হয় নাই তোমার।
বাচ্চা মেয়েটা বাবার কথায় কান দিল না। দূরে বেলুনওয়ালা
পিচ্চির দিকে তার নজর। কাছে আসলেই আবদার করে বসবে।
শিউলি হঠাৎ আদুরে ভঙ্গিতে স্বামীকে বলল, আমারও ঘুম হয় নাই।
ঘুমামু।
বলে স্বামীর কাঁধে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। শিউলির
স্বামী একটু নিচু হয়ে শিউলির মাথাটা সুন্দরভাবে রেখে নিজে
খানিকটা বেকায়দাভাবে বসে রইল। দুজনের মুখেই অদ্ভূত প্রশান্তি।
তাদের চারজনের ছোট্ট সংসারটি যেন ধুলোমাখা বিষাক্ত
নগরীতে থেকেও নেই। অন্য এক প্রশান্তির রাজ্যে তাদের বাস।
মুশফিককে শিউলি দেখেনি একবারও। দেখলেও চিনতে পারবে কি?
মুশফিক বাস থেকে নেমে গেলো। মাথার মধ্যে শুধু একটা কথাই
ঘুরপাক খেতে লাগলো- মানবজনম কত অদ্ভূত! কত অদ্ভূত!
সারাদিনে সে রাস্তায় রাস্তায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ালো।
নিজেও বুঝতে পারলো না তার এমন লাগছে কেন! তাহলে কি সে
আশায় ছিল শিউলি কোনোদিন ফিরে আসবে তার কাছে? তার
হয়ে? সন্ধ্যার দিকে আজানের শব্দে তার ঘোর কাটলো। মসজিদের
সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল সে। নামাজ আদায় করে দোয়া করল, শিউলি
যেন ভালো থাকে। কোনো কষ্ট যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে।
ক্লাস শেষে বের হয়ে মুশফিক দেখল অনন্যা দাঁড়িয়ে আছে। তাকে
দেখে অনন্যা বলল, স্যার আপনার জন্যই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আজ
আপনার দাওয়াত আমার বাড়িতে। আমার জন্মদিন।
-- শুভ জন্মদিন ম্যাম।
-- ধন্যবাদ। যাবেন তো?
-- দেখি।
-- দেখি না। যেতে হবে।
-- আমার আসলে অভ্যাস নেই এসব পার্টিতে যাওয়ার।
অনন্যা দ্রুত বলল, আপনি মোটেও আনকমফোর্টেবল ফিল করবেন না।
ঘরোয়া একটা পার্টি।
-- তাহলে আমি দাওয়াত পাচ্ছি যে?
অনন্যা বলল, এত কথা জানি না। আপনি আসছেন এটাই ফাইনাল।
মুশফিক সন্ধ্যায় নতুন নীল রঙের পাঞ্জাবিটা পরে নেয়। গায়ে
পারফিউম লাগিয়ে চুল আঁচড়ে আয়নায় তাকিয়ে দেখে তাকে
ইদানিং বেশ ভালো দেখায়। এতদিন জীবন গোছানোর ব্যস্ততায়
নিজের দিকে তাকিয়ে দেখার সময় হয়নি। এখন বোধহয় সে সময়
হয়েছে।
অনন্যা ঠিকই বলেছিল, ঘরোয়া অনুষ্ঠান। অনন্যার কিছু বান্ধুবান্ধব
আর দু'একজন আত্মীয় এসেছে শুধু। অনন্যার পরিবার মা বাবা আর
ছোট বোনকে নিয়ে। সবার মনমানসিকতা খুব পরিচ্ছন্ন। হাসিখুশি
পরিবেশ। খাওয়াদাওয়ার পর সবাই আড্ডা দিতে বসল। অনন্যা
শাড়ি পরেছে। সুন্দর লাগছে তাকে। সবাই আবদার করলে অনন্যা
গান গাইলো-
"বধূ কোন আলো লাগলো চোখে..
বুঝি দীপ্তিরূপে ছিলে সূর্যলোকে..."
কথায় কথায় অনন্যা হেসে ওঠে। মুশফিক খেয়াল করল অনন্যার
হাসলে তাকে বেশ সুন্দর দেখায়। প্রথমবার মুশফিকের চোখে
শিউলি ভেসে উঠল না। বাড়ি যেতে যেতে সে ভাবলো অনন্যার
কথা মাকে বলবে।
পরিশিষ্ট: এখনো জ্যেৎস্নালোকিত রাতগুলোতে ঘুম হয় না
মুশফিকের। মাঝরাতে পাশে শুয়ে থাকা অনন্যাকে টেনে তোলে।
অনন্যা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে মুশফিকের কাঁধে ভর দিয়ে ছাদে ওঠে।
ঢাকা শহরের বড় বড় দালানগুলো চাঁদের আলোয় স্বপ্নপুরীর মতো
মনে হয়। মুশফিক কত রকমের গল্প করে! অনন্যার সেসব শুনতে ভালো
লাগে না। সে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে মুশফিকের দিকে।
Previous
Next Post »