কালো মেয়ে

কালো মেয়ে
Black Girl

লাল লিপস্টিক দিস না।তোরে দেখতে ক্ষ্যাত লাগে। সবুজ শাড়িটা পরিস না , তাহলে পাত্রপক্ষ তোর শাড়ি আর সাজ দেখে দৌড়ে পালাবে। পাশে বসে এসব বলে হাসাহাসি করছে নীরু (চাচাতো বোন)। যদিও ওর হাসিটা যুক্তিযুক্ত, কারণ কালো একটা মেয়েকে সবুজ শাড়ি বা লাল লিপস্টিক হয়তো বিদঘুটে লাগে। কিন্তু ওর হাসিটা আমার কাছে বিশ্রী লাগছে।

তাই রুমের দক্ষিণ পাশের দরজাটা অতিক্রম করে বারান্দায় দাঁড়ালাম। ভীষণ মন খারাপ লাগছে! এক দু'ফোটা পানিও চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো। আল্লাহ্ কেন আমাকে কালো বানিয়ে দুনিয়াতে পাঠালেন?

পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে বসলাম।আ উনাদের সামনে বসে আছি ঠিকই কিন্তু, সহজ হতে পারছি না। ধুম করে ছেলের মা কপাল কুঁচকে বলে দিলো, এই মেয়েতো কালো! শেষ পর্যন্ত কালো মেয়েকে ঘরের বউ করে নিতে সবাই রাজি হলো।

বেশ ধুমধাম করেই আমার বিয়েটা হলো। টাকা পয়সা কম ছিলো না আমাদের। মা-বাবা তিন বোন আর এক ভাইকে নিয়ে আমার পরিবার।

আমি সবার বড়।

বিয়ের রাতে নিনাদ (আমার সদ্য বিয়ে করা বর) আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো, শোনো, তোমার মত একটা কালো মেয়েকে লালন পালন করা বা সংসার করা কোনোটাই করার ইচ্ছা বা মনমানসিকতা আমার নেই।
সুতরাং, আমার থেকে কোনো কিছুই আশা করবা না।আর হ্যাঁ, বছরখানেকের মাথায় আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো।

তাহলে বিয়ে কেন করেছেন? অবাক হয়ে এই প্রশ্নটা নিনাদকে করলাম। টাকার প্রয়োজন ছিলো, তাই বিয়ে করেছি। তাছাড়া এটাকে বিয়ে বলে নাকি? বিয়ের নামে ঘাড়ের বোজা দূর করেছে তোমার বাবা। ঘরের বোজা হয়ে বসেছিলে তো তাই বিদায় করার ধান্দা ছিলো।

আমি মনে হয় কিছুই বুঝিনা! কিছুই বললাম না নিনাদকে। থমকে গেলাম উনার কটু কথাগুলো শুনে!
অথচ, আমি কখনো নিজেকে বাবার বাড়ির বোজা মনে করতাম না। কারণ, মেয়েরা তো বাবার বাড়ির বোজা হয় না! কেন জানিনা, নিনাদের কথার মধ্যে যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি যদিও বিশ্বাস করতে পারছি না।

বাকি দু বোন বিয়ের উপযুক্ত। আমার জন্য ওদের বিয়ে হচ্ছে না। তার  জন্যই কি বাবা আমায় টাকা দিয়ে বিয়ে দিলেন? দিন কাটতে লাগলো। কিন্তু, নিনাদকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও পাশে পেতাম না। সকালে বেরিয়ে যেতো আর ফিরে আসতো অনেক রাত করে। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম নিনাদের সাথে সংসার করার। বেহায়ার মত ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু, হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম ওর অন্য একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে। আফসোস করিনি, তবে ভীষণ কষ্ট হয়েছে নিজের জন্য। আমি ওর যোগ্য হয়ে উঠতে পারলাম না।

বিয়ের বছর খানেকের মাথায় ও আমাকে ডিভোর্সের ব্যাপারে বললো। ওকে ছাড়তে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু কিছুই বলিনি। কারণ, ও তো কখনোই আমার ছিলো না! তাহলে কিভাবে ওকে আমি ধরে রাখবো?
ডিভোর্সের জন্য আরও তিন মাস সময় লাগবে। এই তিন মাস ও আমার সাথে থাকতে চাইলো না। ও আমাকে জানিয়ে দিলো আমি যেন ব্যাগ গুঁছিয়ে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে তৈরি হয়ে থাকি। নিনাদ
গাড়ি পাঠিয়ে দিবে।

যে বাড়িতে নিজের বলতে কিছুই নেই সেই বাড়ি থেকে আর কি বা গুঁছিয়ে নিবো! কিছুক্ষণ পর ঠিকই গাড়ি আসলো কিন্তু নিনাদ আসলো না।

চলে আসলাম বাবার বাড়িতে। পুরো বাড়িটা থমকে আছে। আমার ফিরে আসাটা হয়তো কেউই মেনে নিতে পারছে না। বাড়িতে ঢুকে সোজা নিজের রুমে গেলাম। কিন্তু, আমার রুমে তালা দেওয়া। খুশি হয়েছিলাম তালা দেখে, মা হয়তো যত্ন করে রুমটা গুঁছিয়ে রেখেছে উনার বড় মেয়ের জন্য।

রুমের চাবির জন্য মায়ের রুমে যেতেই বাবাকে বলতে শুনলাম, একটুও বিবেক বুদ্ধি নেই তোমার মেয়ের! এত টাকা খরচ করে বিদায় করলাম, এখন তো ঠিকই ফেরত এসে উঠলো! একবারও নিজের বাবা মা বোনদের কথা ভেবেছে ও?এখন কেউ জিজ্ঞেস করলে কি বলবো? আমার বড় মেয়েকে জামাই ছেড়ে দিয়েছে নাকি ও ডিভোর্সি? দু'পা পিছিয়ে পর্দার আড়ালে চলে গেলাম। কথাগুলো হজম হচ্ছে না। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। যে বাবা মায়ের কাছে জীবনের বিস্তৃত অধ্যায়টা পার করলাম আজ তারাই আমাকে নিয়ে বিব্রত! আচ্ছা ডিভোর্সি মেয়ে মানেই নিকৃষ্ট?
ভালো করে চোখের পানি মুছে মায়ের রুমে প্রবেশ করলাম। মা-বাবাকে বুঝতে দিলাম না যে তাদের কথাগুলো আমি শুনেছি।

মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বললাম,
--মা, রুমের চাবিটা দাও তো।
--কোন রুমের চাবি?
--আমার রুমের।
--ওটা এখন স্টোর রুম।

কথাটা বলে মা উঠে গেলেন আমার সামনে থেকে। আমি কোথায় থাকবো কি করবো কিছুই বললো না।
নিনাদ আমাকে ডিভোর্স দিবে শুনেও এতটা কষ্ট হয়নি, কারণ, আমি ভাবতাম আমার বাবা-মা পুরো পরিবার তো আছেন। পায়ের তলার মাটিটা এখনও শক্ত। ভেবেছিলাম এই বাড়িতে আসার পর মা বুকে
জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিবেন। বাবা কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলবেন, চিন্তা কিসের তোর? আমি তো আছি।

মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে ছোট বোনের রুমে গেলাম।ওর বিছানায় মাথাটা রাখলাম। ছোট বোন ভার্সিটিতে ছিলো। জানিনা, ওর সাপোর্ট পাবো কিনা? কিন্তু ছোট থেকেই বোনটা আমাকে খুব সাপোর্ট করতো।

ভাবতে লাগলাম, কি করবো? এভাবে কি বাঁচতে পারবো আমি? অনেক ভেঙে পড়লাম। সব এলোমেলো হয়ে গেলো। নিনাদের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিলো।

বাবার বাড়িতে দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছিলো।তিনমাস পর নিনাদ ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিয়েছিলো। একটুকরো কাগজে ছোট্ট একটা স্বাক্ষর তছনছ করে দিলো আমার জীবন টা। কিন্তু, আমাকে বাঁচার অনুপ্রেরণা দিয়েছে আমার ছোট্ট বোনটা। ও
সবসময় আমায় ছায়ার মত আগলে রাখতো। ডিভোর্স হওয়ার কিছুদিন পর একদিন তিতলি (আমার ছোট বোন) আমার কাছে এসে বললো,

--আপু, তোর জন্য একটা চাকরীর ব্যবস্থা করেছি।করবি চাকরী?

--নারে। আমার ভালো লাগে না।
--এভাবে বাড়িতে বসে থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবি।

নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শেখ জানিস আপু, জীবনের কঠিন সময়গুলোতে উঠে দাঁড়াতে হয়, ফাইট করতে হয় সমস্যার সাথে। এভাবে পড়ে থাকলে তো হবে না।
আসলে তুই ভাবছিস তুই কিছুরই যোগ্য নয়, তাইতো?শোন আপু, যোগ্যতা দেখাতে হয় আর শোন, নিনাদ ভাইয়াই তোর যোগ্য ছিলো না।

--আমি কি পারবো চাকরী করতে? কালো মেয়েদের চাকরী হয়?

--শোন, চাকরীর কাছে কালো ফর্সা কোনো বিষয় না।

তোর যোগ্যতাটা দেখা বোন। জীবনটাকে নেতিবাচক না ভেবে ইতিবাচক ভাব। সেদিন তিতলির কথা শুনে চাকরীটা নিয়েছিলাম। নিজের পছন্দগুলোকে প্রধান্য দিতে শুরু করলাম। আজকাল সবুজ শাড়িও পরি।
ব্যস্ততা মানুষকে নানান কিছু ঠিকই ভুলিয়ে রাখে কিন্তু সেটা সাময়িক। তারপরেও অনেকটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় দিনগুলো ব্যস্ততার সাথে অতিবাহিত করার চেষ্টা। সেদিন চাকরীর উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ, ঔষুধের দোকানে নিনাদকে দেখতে পাই। কিসের ঔষুধ নিলো বুঝতে পারলাম না।ওকে পেছন থেকে অনুসরণ করলাম। দেখি ও হসপিটালে আসছে। ওর পেছন পেছন আমিও হসপিটালে যাই।

আড়াল থেকেই বুঝতে পারলাম ও আবার বিয়ে করেছে এবং সেই মেয়েটার আজ বাচ্চা হবে। মেয়েটা নিশ্চয় খুব সুন্দর! কারণ, নিনাদ তো কালো মেয়েকে পছন্দ করেনা। অজান্তে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। মায়া জিনিসটা হয়তো এমনই! অফিসে আর গেলাম না।আড়াল থেকে অপেক্ষা করছি নিনাদের বাচ্চাকে দেখার! কিছুক্ষণ পর বাচ্চার কাঁন্নার আওয়াজ শোনা গেলো। ডাক্তার নিউজ দিলো নিনাদের একজন কন্যা সন্তান হয়েছে! তাকিয়ে দেখলাম নিনাদ খুশিতে আত্মহারা! বাচ্চাকে দেখার জন্য সবাই কেবিনে গেলো।ওদের পেছন পেছন আমিও ঢুকলাম কেবিনে। নিনাদ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে। আর ওর সামনে গিয়ে আমি দাঁড়িয়েছি। আমিও অবাক দৃষ্টিতে বাচ্চাটাকে দেখছি! হঠাৎ, খেয়াল করলাম নিনাদ আমাকে দেখছে।
নিনাদ এবং পরিবারের সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, বাচ্চাটাকে একবছর পর কি করবা কিছু ভাবলে? শোনো, যদি বাচ্চাটাকে লালন পালন করার ইচ্ছা বা মন মানসিকতা না থাকে তাহলে আমাকে দিয়ে দিও। কারণ, কুচকুচে কালো হলেও ও একটা প্রাণ! ও একজন মানুষ।

আমার কথা শুনে নিনাদ কাঁদছে। জানিনা এই কাঁন্না কিসের? তবে আমি কখনো এমনটা চাইনি। আমার মত আরেকটা কুচকুচে কালো মেয়ে এই পৃথিবীতে আসুক। কখনোই চাইনি।
Previous
Next Post »