অপরিচিত সেই মেয়েটি

অপরিচিত সেই মেয়েটি,
অপরিচিত সেই মেয়েটি

একটি মেয়ের দিকে আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছি। মেয়েটি
দেখতে বেশ সুন্দর এমন কোন কারনে না। আমার মনে হচ্ছে সে
আমার পূর্ব পরিচিত। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না মেয়েটি
আসলে কে ? তার কাছে গিয়ে জিগ্যেস করবার সাহস পাচ্ছি না।
মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। হয়তো তারও আমাকে
পরিচিত মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই কথা বলবে।
-- এই যে মিস্টার আমি অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছি আপনি আমার
দিকে ভ্যাবলা কান্তের মতো তাকিয়ে আছেন, কারণটা জানতে
পারি ?
হঠাৎ করে কোন মেয়ের এমন ধরনের কথায়। আমি আসলেই ভ্যাবলা
কান্ত হয়ে গেছি। তার এই প্রশ্নের উত্তরে কি বলা যায় ভেবে
পাচ্ছি না । থতমত ধরনের ভঙ্গিতে বললাম। আপনাকে আমার খুব
পরিচিত মনে হচ্ছিলো, তাই তাকিয়ে ছিলাম।
সব মেয়েদের বুঝি আপনাদের পরিচিত মনে হয় ? কেন ? এমনটা না
করলে হয় না। আপনাকে এর অাগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হয়
না।
কিন্তু আমি আপনাকে অবশ্যই দেখেছি। দেখেছি বললে ভুল হবে
আপনি আমার বেশ পরিচিত।
অাপনি হয়তো নেশাভাং করেন। মনে হয় অাজ একটু বেশি খেয়ে
ফেলেছেন। অাপনি যে পদ্ধতি ধরেছেন। এটা অনেক পুরনো হয়ে
গেছে। বাড়াবাড়ি করলে ইভটিজার বলে ধোলাই খাবার ব্যবস্থা
করব।
কি সাংঘাতিক মেয়েরে বাবা! সুন্দরী মেয়েরা অহংকারী রগচটা
বা অভদ্র এসব এক সাথে হয় না। হলে যে কোন দুটা এক সাথে হবে। এ
দেখি সব গুণে গুণান্বিত।
.
আমি এখন রাস্তা দিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছি। আর বারবার মনে
করার চেষ্টা করছি। মেয়েটি আসলে কে ? আদৌ তাকে আমি
চিনি। নাকি সবটাই আমার অবচেতন মনের ভুল। অাজকাল এই এক
মারাত্মক সমস্যায় ভুগছি। ভুলে যাওয়া রোগ, সবকিছু ভুলে যাই।
সকালে কি খেয়েছি তা বিকেলে মনে করতে চাইলে বহুক্ষণ ভেবে
বলতে হয়। মস্তিষ্কের যেখানে স্মৃতির ঘর অাছে। সেখানে বোধয়
কোন গণ্ডগোল ঘটেছে। হয়তো স্মৃতির লিস্টটা গায়েব। যেহেতু
ব্রেইনে জমা রাখা লিস্ট গায়েব হয়ে গেছে। তাই চেনা কারও
সাথে দেখা হলে তাদের চিনতে পারি না। একজন মাথার ভেতরের
ডাক্তার এসব ভালো বলতে পারবে।অারও একটা সাংঘাতিক
সমস্যা হলো। মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তেই বইয়ে পড়া লাইন গুলো
বিড়বিড় করতে থাকি। এখন সেটাই করলাম। কবে যেন এই লাইনগুলো
কোথায় পড়েছিলাম। বইটা অসম্ভব ভালো ছিল।সেখানে অারও
পড়েছিলাম।
--দেখা যাবে একদিন অামি কাউকেই চিনতে পারছি না,সবাই
অপরিচিত। অবশ্য অামার ধারনা সেই অভিজ্ঞতাও মজার
অভিজ্ঞতা হবে।৬০০ কোটি মানুষের বিশাল পৃথিবী অামি কাউকে
চিনতে পারছি না।
.
বাস্তবে যদি এমন কিছুু অামার সাথে ঘটে। তবে হয়তো লেখককে
জানাতে পারতাম। কাউকে না চিনতে পারার অনুভূতি সম্পর্কে।
সম্ভবত শতকোটি মানুষের বিসাল পৃথিবীতে,কাউকে না চেনার
অভিজ্ঞতা খুব একটা মজার হবে না।
ব্যপারটা ভাবতেই অবাক লাগে। শতকোটি মানুষের বিশাল পৃথিবী
অামি কাউকে চিনতে পারছি না।অাজকাল মাথাভর্তি এমন সব
অদ্ভুত চিন্তা ঘুরপাক খায়। তখন নিজেকে কেমন যেন অদ্ভুত কোন
প্রাণী মনে হয়। অকারনেই খুব অস্বস্তিতে ভুগতে থাকি।
.
রাত ন'টার মত বাজে এমন কিছু রাত হয়নি কিন্তু বাড়িতে মনে হচ্ছে
নিশুতি। কোন সাড়াশব্দ নেই, একদম ভুতুড়ে পরিবেশ। বিশাল এই
বাড়িতে শুধু অামি অার ছোটখালা থাকি। ছোট খালার ছেলে সবুজ
ভাই ক্যন্সারের সাহায্যে খুব অল্পতেই ওপারে পারি জমিয়েছে।
খালুজান তার একমাত্র পুত্রের অকালমৃত্যু শোক সহ্য করতে না
পেরে, ছেলের পথেই হেটেছে। এখন এই নিষ্ঠুর দুনিয়াতে খালা
বেঁচে অাছে শুধু বেঁচে থাকার জন্য। তার শরীর পৃথিবীর বুকে ঘুরে
বেড়ালেও মনটা কিন্তু পরোপারে যাওয়ার প্রহর গুনছে।
.
অামি সবুজ ভাইয়ের রুমে থাকি। রুমটা বইয়ে ভর্তি কয়েকটা সেলফ।
একটা নীল রঙের গিটার সবুজ ভাইয়ের অস্তিত্বধারণ করছে।
বেশকিছুদিন ধরে রোজ রাতে কেন কারন ছাড়াই মনখারাপ হয়।
প্রতিদিন অামি অনেক চেষ্টা করি মন প্রফুল্ল রাখতে। কিন্তু কোন
না কোন সময় ভীষণ মন খারাপ করে বসে। যেনো কোন অদ্ভুত উপায়ে
অামার শরীরের ভেতর একটা মন খারাপের মেডিসিন ঢুকে গেছে।
প্রতিরাতে একটা সময় পর অার কিছুই ভালোলাগে না। কেমন যেন
অস্বস্তিতে ভুগতে থাকি। তাই এই বিরক্তিকর সময়টা কাটানোর
মোটামুটি একটা পদ্ধতি বের করে ফেলেছি। অামি লক্ষ করেছি,
মন খারাপ হলে সবুজ ভাইয়ের সেলফ থেকে যেকোন একটা বই পড়তে
বেশ ভালোলাগে। প্রায় প্রতিটা বইয়ের পৃষ্ঠা তার নিজের কিছু
লাইন ছন্দ লেখা থাকে। এখন পড়ছি মন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একটা
বই। মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে এখানে খুব সুন্দর করে উদাহরণ দিয়ে
বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা। বইটা বেশ অাগ্রহের সাথে পড়ছি।
প্রতিটা পৃষ্ঠা শেষ হতেই পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর অাগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি
পাচ্ছে। কিন্তু এবার পৃষ্ঠায় উল্টোতেই একটা ছবি দেখতে পেলাম।
একটা মেয়ের ছবি। মেয়েটা হুলুদশাড়ি পড়ে অাছে।সে তার এক হাত
দিয়ে কানের কাছে এক গোছা চুল গুঁজতে গুঁজতে হাসছে। ছবির
পেছনে তারিখ দেয়া ১৫-০৯-২০১৫। অথচ অাজকের তারিখ
২৫-০৮-২০১৭। প্রায় বছর দুয়েক অাগের ছবি।
কিন্তু ছবির এই বালিকাকে অামার খুব চেনা লাগছে। তাকে
কোথায় যেন দেখেছি। খুবকরে চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম
না। পাশে ধুলাবালি ভর্তি একটা হলুদ রঙের ডায়েরি। সেদিন
সেলফ গোছাতে গিয়ে। ছবিটা ডায়েরির ভেতর থেকে নিচে পরে
যায়। খুব ব্যস্তভাবে ছবিটা এই বইয়ের মধ্যে রেখেছিলাম।
ভেবেছিলাম ডায়েরির লেখাগুলো পড়ার কথা। সবকিছুর মত ভুলে
গেলাম। কিন্তু ছবির এই মেয়েটা কে? অার কেনই বা তাকে
পরিচিত মনে হচ্ছে। অাজ এভাবেই কেন একজনকে পরিচিত মনে
হচ্ছিল। অামি চমকে উঠলাম। ছবিটা হুবুহু অাজকের সেই মেয়েটার
সাথে মিলে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক সমীকরণের মধ্যে অামি। কেমন যেন
বেশ মন খারাপের মত লাগছে।হয়তো অামি কি হ্যালুসিনেশনে
ভুগছি ? অামার সমস্ত শরীর ঘেমে গেছে। অাজ মেয়েটাকে
পরিচিত লাগার কারনটা খুঁজে পেয়েছি। অথচ মেয়েটা অামাকে
ভ্যাবলা বলে ফেলল।
অপরিচিতার ছবি সবুজ ভাইয়ের ডায়েরিতে থাকার কারনটা বুঝতে
পারলাম না। বেশ রহস্যজনক একটা বিষয়। হালকা শীতের মধ্যে
শরীরের ঘাম শুখিয়ে। সমগ্র শরীর তিরতির করে কাঁপছে। ঘরের
ভেতর কেমন দম বন্ধ অবস্থা। কিছু রহস্যময়ী প্রশ্ন অামার ভেতরটা
এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে।ডায়েরির প্রথম পাতায় হাতে অাঁকা
একটা ছবি।ছবির নিচে খুব ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা "প্রিয় নিঝুম"!
ছাবিটা দেখতে একদম বাস্তব মেয়েটার মত। মনেহচ্ছে এই ছবিতে
শিল্পীর বেশ যত্ন ও ভালোবাসা অাছে। পরের পৃষ্ঠায় লেখা,
"নিঝুম তোমায় প্রথম দেখাতেই খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছি।
অাজ সারাদিন লাগলো শুধু মাত্র তোমার নামটা জানতে।"
ডায়েরির শেষের পৃষ্ঠা একেবারে বিদ্ধস্ত হয়ে অাছে।খুব সহজেই
বুঝতে পারছি এসব সবুজ ভাইয়ের কান্নার ছাপ। বৃষ্টিভেজা
কাগজের মত পৃষ্ঠার অনেক যায়গার লেখা গুলো ফেকাসে হয়ে
অাছে।
" নিঝুম অামার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ডাক্তার বলেছেন, মাত্র অল্প
কদিন বেঁচে অাছি। জীবনে অনেক কিছু করার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু
সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের কাছে অামার ইচ্ছেটা অার পেরে উঠলো না।
অামি চেয়েছিলাম তোমায় নিয়ে জীবনের সবটুকু সময় কাটাতে।
কিন্তু তা অার পারলাম কই বলো।এই শেষ সময় এসেও, তোমাকে
প্রথম দেখা দিনটার কথা খুব মনে পরছে। পিটপিট করে একে অপরের
দিকে তাকানো। অামি বেশ লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন। তারপর
থেকে এখন পর্যন্ত। প্রতিটা মুহূর্তে তোমার জন্য অামার সৃষ্ট অনুভূত
গুলো এখানে জমিয়ে রেখেছি। ভেবেছিলাম অামাদের সম্পর্কটা
পুরোপুরিভাবে হয়ে যাওয়ার পরে। একটা রঙিন কাপড়ে মুড়িয়ে এই
ডায়েরিটা তোমায় উপহার হিসেবে পাঠাব। তুমি প্রতিটা পৃষ্ঠার
মধ্যে খুঁজে পেতে তোমার জন্য অামার উন্মাদনা গুলো। কিন্তু
সেসবের কিছুই হলো না। যখন জানতে পারলাম ক্যন্সারের পোঁকা
অামাকে প্রতিনিয়ত খুঁটেখুঁটে ক্ষয় করে চলছে। তখন থেকেই
তোমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। তোমার দৃষ্টির
অগোচরে রয়েছি। এসব করে সত্যিই তোমার থেকে দূরে থাকতে
পেরেছি। কিন্তু ভুলে থাকাটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যেমনটা অামার
বেঁচে থাকাটা অসম্ভব। তেমন ভাবে তোমাকে ভুলে থাকাও অসম্ভব
নিঝুম।
অামার চোখ টলটল করছে। অামি চাই না অামার চোখের বিন্দুমাত্র
জলের স্পর্শ এই ডায়েরির পাতায় লাগুক। এখানে শুধুমাত্র সবুজের
চোখের জলের গন্ধ থাকবে তার নিঝুমের জন্য। অামি ঠিক করেছি
ডায়েরি খানা নিঝুমের কাছে পৌছে দিব। যে অনুভূতি এতদিন ধরে
যার জন্য জমা অাছে। সে অনুভূতি গুলো তার কাছেই প্রকাশ পাবে।
অামার কাছে সবুজ ভাইয়ের শেষ স্মৃতি স্বরূপ যে রঙিন টি-শার্টটা
রেখেছিলাম। তাতে এই ডায়েরিটা মুড়িয়ে তাকে দিব। কারন সবুজ
ভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো ডায়েরিটা রঙিন কাপড়ে মুড়িয়ে দেয়ার।
অামি সেটাই করব। অপ্রকাশিত অনুভূতি গুলোর প্রকাশ যথাস্থনে
হবে।
শুরুতে হয়তো সে উপহারটা নিতে চাইবে না।অামাকে চড়থাপ্পরও
দিয়ে ফেলতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে এটা গ্রহন করে। ততক্ষণ
পর্যন্ত অামি অাপরিচিতার সামনে দাড়িয়ে থাকব।
Previous
Next Post »