ছেলেমানুষী ~ WriterMosharef

ছেলেমানুষী

ছেলেমানুষী

আপনার বুকে একটু হাতটা রাখতে দিবেন? "
"এসব কোন ধরনের কথাবার্তা? মানুষে হুনলে কী কইবো কও দেখি?"
"কিছু কইবো না আপনি আমার স্বামী অতএব কেউ কিছু কইবো না।"
"আচ্ছা হইছে এইবার হাত সরাও নীলা। "
- না হাত সরামুনা আপনারে একটা কথা কই?
- বইলা ফালাও।
- আপনি আমার থাইকা ২০ বছরের বড়। আপনার কি লজ্জা করে নাই?
কেমনে আমার মত কুড়ি বছরের মাইয়ারে বিয়া করলেন?
- এই দেখো আলাপের ধরণ। পাগলামি আলাপ করলে আমি কিন্তু
বারান্দায় গিয়ে ঘুমামো তাইলে।
- বারান্দাতেই যান আমি এই আলাপই করমু আইজ।
আকবর মিয়া দ্রুতগতিতে বালিশ আর কম্বল নিয়ে বারান্দায় ঘুমাতে
গেলেন। এই অল্প বয়সী মেয়ের কথা শুনলে তারা আর ঘুম হবেনা।
কেন যে অল্প বয়সী মেয়ে তিনি বিয়ে করলেন উফফ। বাচ্চাদের
মতো কথাবার্তা বলে। হঠাৎ আবদার করে বসে "আমারে একটু শাড়ি
পরাইয়া দিবেন? "
"আমার চুলগুলো একটু ধরবেন। "
অথবা গোসলখানা থাইকা ডাক দিবে গলা ছাইড়া "গামছাটা ভুলে
আনি নাই একটু দিবেন।"
আকবর মিয়া শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। বারান্দায় মশার ভয়
আছে। তাই একটা কয়েল জ্বালিয়ে নিয়েছেন শোবার আগে।
বারান্দায় শুয়ে পরার আর কিছুক্ষণ পর সেখানে নীলাও গিয়ে তার
পাশে বিছানা করেছে। আকবর মিয়া বুঝেও না বুঝার ভান করে
শুয়ে আছেন। নীলা ধীরে ধীরে উনার হাতটা ধরতেই আকবর মিয়া
বুঝে ফেললেন আজ আর ঘুম হবেনা। এই মেয়েটার পাগলামো সহ্য
করা লাগবো।
নীলা বিড়বিড় করে বলে "আপনি এখনই ঘুমাইয়েন না। দেখুন কেমন
ফকফকা জ্যোৎস্না নামছে দুনিয়ার উপর। এইসব দেখতে হয়। নাইলে
জ্যোৎস্না রাগ করে । সৌন্দর্যের অমর্যাদা হয়। "
আকবর মিয়া উঠে বসেছে। তার চোখে এখন আর ঘুম নেই। নীলা
কিছুটা কাছে এসে আকবর মিয়ার সাথে একইভাবে পুব আকাশে মুখ
করে বসেছে। নীলা নিচু স্বরে বলে
" দেখুন দেখুন ওই কদমতলীর ছোট্ট পুকুরের ওপরে কেমন কইরা
জ্যোৎস্না পড়ছে। চিকচিক করতাছে। আর এই এইযে নন্দীরার
বাঁশবনের উপরও কত সুন্দর জ্যোৎস্না। খেয়াল করলে বুঝবেন
দুনিয়াটা কত সুন্দর।"
অল্প বয়সী এই মাইয়াটা মিথ্যা বলে নাই। আকবর মিয়ারো ভালো
লাগে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে। অবাক হয়ে তিনি লক্ষ্য করেন
সত্যিই পৃথিবীটা কত সুন্দর। একটা রাত ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়া যায়
আবার একটু কম ঘুমিয়ে মাঝেমধ্যে ইহার সৌন্দর্য লুটে নেয়া যায়।
দুই তলায় থাকেন উনারা। দাদার আমলের এই ঘরটি টিনের হলেও
দুতলা। নিচে কেউ থাকেনা। ধান-পাট আর সব শস্য রাখা নিচের
তলায়। আর উপরে থাকেন এনারা। আকবর মিয়ার দুনিয়ায় কেউ নাই
শুধু এই অপরিপক্ক স্ত্রী ছাড়া। কিছুক্ষণ পর আকবর মিয়া খেয়াল
করলেন তার চোখের ঘুম যেন সহস্রকাল দূরে পলায়ন করেছে। অবাক
হয়ে তিনি দূরের মাঠে তাকায়। জ্যোৎস্নায় উজ্জ্বল হয়ে আছে
সেসব। এই মাঠে কত স্মৃতি তার। একসময় দাদা কাজ করতো এরপর
বাবা কাজ করতো। আর এখন আর কেউই নাই। মাঠের পাশের সরু
রাস্তার মাথার ঝোপটায় জ্যোৎস্না পড়েছে তীব্র ভাবে। এটার
ঠিক পিছনেই একটা ভাঙ্গা মন্দির আছে এখনো। আহা মুসলিম হলেও
এককালে কত যেতেন সেখানে। কত আনন্দ উল্লাস। সব যেন ফুরায়ে
গেছে। এক নিয়মের জীবনের ঢুকে গেছেন এখন। কোথায় সেই
দুশ্চিন্তাহীন সাবলীল সুন্দর দিন? কোথায় সেই বন্ধু বান্ধব? কোথায়
সে আনন্দ উৎসব, ঈদ, পূজো? সবকিছু যেন লাজুক মুখে কালের গর্ভে
হারিয়ে গেছে।
নীলা আকবর মিয়ার হাত ধরে গজল গাইছে। জ্যোৎস্না রাতের
নিস্তব্ধ বাঁশবনের পাশের এই ছোট্ট ঘরের লক্ষ্মী বউটার কন্ঠে যেন
তারা ভরা রাতটা আনন্দিত ও প্রফুল্লিত হয়ে উঠল। আঁধার যেন নীরব
চোখে নীলার দিকে চেয়ে আছে। গহীন বনের পাখিরাও যেন ঘুম
হতে জেগে ওঠে মিষ্টি গলার এই গজলটা শুনছে।
"আহা রাতটা শেষ না হোক। গজলটা শেষ না হোক। "
এটাই সবার আবদার।
আকবর মিয়ার চোখে জল এসে গেছে। একটা হাত নীলার হাতে অন্য
হাত দিয়ে চোখ মুছে আর ভাবে,
" মাঝেমধ্যে এমন ছেলেমানুষীরও দরকার আছে। পৃথিবীতে এসেছি
আর এই পৃথিবীর সৌন্দর্য শুধু শুধু না দেখে যাওয়ার কোন মানে
হয়না। বিধাতার অপরূপ সৃষ্টি উপলব্ধি করতে এরকম স্ত্রী পাওয়াও
ভাগ্যের ব্যাপার।"
একটু পর আকবর মিয়া রান্না ঘর হতে মুড়ি আনলেন পাতিলে করে।
তিনিও চান আজ নির্ঘুম ও গল্পময় হোক রাতটা। ঘুম না আসুক। নীলা
আর উনার মাঝামাঝি পাতিলটা রেখে জেগে থাকার প্রস্তুতি
নিলেন।
কে বলবে এই সংসারটা অভাবে আছে। কে বলবে এই সংসারটাতেই
রোজ পাতিলে রান্না হয়ে ওঠে না। কে বলবে এরাই বছরের পর বছর
এক জামাতে দিন কাটায়?
কোনো অভাব নাই। ভালোবাসা থাকলে আর ভালোবাসার মতো
মানুষ থাকলে আর কী বেশি কিছু লাগে?
Previous
Next Post »