মনের অন্তরালে পর্ব ০১

মনের অন্তরালে, মনের অন্তরালে পর্ব ০১, moner antarale, moner antarale part 01
মনের অন্তরালে

প্রতিদিনকার মতো মিম আজও কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরছে। তখন
সন্ধ্যা নামছে কেবল। মিম নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে আর অফিস
ড্রেসে আছে। প্রতিদিন এই সময়টাতে মিম কাঁদতে কাঁদতেই বাসায়
ফিরে। যেই মিম রায়হান পুরো দুনিয়া অবজ্ঞা করে চলে সেই মিম
রায়হান কাঁদতেও জানে?? মিম গাড়ি থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ
মুচছিলো আর ড্রাইভ করছিলো তখন হঠাৎ ই একটা গাড়ির সাথে
মিমের গাড়ির ধাক্কা লেগে যায় আর অন্য গাড়িটার কাঁচ ভেঙ্গে
যায়। মিম দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দেখে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা
গাড়িতে বসে আছে মাথা ধরে আর কাঁচের টুকরা লেগে মাথা
কেটে গেছে।
-ও মাই গড! আন্টি আপনি ঠিক আছেন? (গাড়ির দরজা দ্রুত খুলে মিম)
-হ্যা আমি ঠিক আছি। (চোখ বন্ধ করেই কাঁতরাচ্ছে মহিলাটি)
-ম্যাডাম কি হয়েছে আপনার? স্যারকে কল করব? (দ্রুত গাড়ি থেকে
নেমে মহিলার ড্রাইভার)
-না না আব্বুকে কল করার দরকার নেই। (মহিলাটি)
-আন্টি আপনার কপাল তো কেটে গেছে। প্লিজ চলুন। আপনাকে
হসপিটালে নিয়ে যাব। ড্রাইভার তুমি গাড়িটা রিপ্যায়ার করে
নিও। এই নাও আমার কার্ড। কালকে পেমেন্ট করে দিব।
(মহিলাটিকে বাইরে বের করে মিম)
-না না লাগবেনা পেমেন্ট করা। আমি বাসায় গিয়ে ব্যান্ডেজ
করতে পারব, তুমি অধৈর্য হয়ো না। (মহিলাটি মিমকে বলল)
-না আন্টি চলেন প্লিজ। আর তোমাকে যা বললাম কর।
মিম মিমের গাড়ি নিয়ে মহিলাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলো।
ব্যান্ডেজ আর ওষুধপত্র কিনে নিয়ে মিম মহিলাকে তার বাসায়
ছেড়ে দিয়ে আসলো। এইদিকে মিমের বাপি ননস্টপ মিমকে কল
করে যাচ্ছে লেইট হচ্ছে বলে। মিম আন্টিকে বাসায় দিয়ে বের
হওয়ার সময় আন্টি হঠাৎ ই অবাক হয়ে বললেন,
-তুমি ফেমাস ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট মিম রায়হান না? রায়হান গ্রুপ অফ
কোম্পানির এমডি?
-হ্যা আন্টি আমিই মিম রায়হান।
-দেখেছো আমি তোমায় খেয়ালই করিনি এতক্ষণ। প্লিজ বসো।
-না আন্টি বসব না। বাপি কল দিচ্ছে। বাসায় যেতে হবে। আপনি
নিজের খেয়াল রাখবেন।
ওতটুকু বলেই মিম গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মিম দ্রুত গাড়ি
চালাচ্ছে আর কানে ব্লুটুথ লাগানো। আবার বাপির কল আসায় মিম
রিসিভ করলো ড্রাইভ করতে করতেই।
-হ্যা বাপি বলো।
-কোথায় তুমি? কতগুলা কল দিলাম? টেনশন হচ্ছে তো আমার।
(উত্তেজিত হয়ে মিমের বাপি)
-দশ মিনিট লাগবে। আসছি। এরপর বলছি সব।
-তারাতারি আসো।
মিম ফোন কেটে দিয়ে বাসায় গেলো। গাড়ি পার্ক করে বাসায়
ঢুকেই দেখে বাপি ড্রইংরুমে বসা আর পাশে কাজের মেয়েটা শরবত
হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-কি হয়েছে বাপি খায়নি? (কাজের মেয়েকে জিজ্ঞেস করল মিম)
-না ম্যাম। স্যারকে কত করে বললাম খেয়ে নেন স্যার নয়ত ম্যাম
আমার উপর রাগ করবে। স্যার আপনার জন্য চিন্তায় অস্থির হয়ে
যাচ্ছিলেন। (কাজের মেয়ে)
-বাপি তুমি এমন কেন কর? তোমায় না বলেছি ঠিকমতো খেতে? আর
আমি তো এখন চলে এসেছি। এখন খাও। দাও তো আমায় গ্লাসটা।
(কাজের মেয়েকে বলল মিম)
-এই নিন ম্যাম।
মিম নিজের হাতে বাপিকে খাইয়ে দিলো। মিস্টার রায়হান
মিমকে ছাড়া কিছু বুঝেন না আর মিমের পুরো দুনিয়া একদিকে আর
বাপি আরেকদিকে। এরপর মিম বাপিকে বলল রাস্তার ঘটনা। মিমের
বাপি অস্থির হয়ে যান শুনে আর মিমকে বলেন,
-কালকে থেকে তুমি ড্রাইভার নিয়ে যাবে সব জায়গায়। তুমি
ড্রাইভ করবেনা।
-বাপি তুমি তো জানো আমার নিজেরই ড্রাইভ করতে খুব ভালো
লাগে ইভেন এইটা আমার টেন্ডেন্সি।
-তোমার কিছু হয়ে গেলে পরে আমি কি নিয়ে বাঁচবো? (মিমের
গালে হাত রেখে বাপি)
-কিছু হবেনা আমার। তুমি আছো না? (বাপিকে জড়িয়ে ধরে মিম)
-যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। ডিনার করবানা?
-হ্যা তুমি বসো। আমি আসছি।
মিম উঠে চলে যায় ফ্রেশ হওয়ার জন্য। মিমের দুনিয়ার শান্তিই
হচ্ছে ওর বাপি আর ওর বাপির ও তাই। মিম ফ্রেশ হয়ে এসে ডিনার
করে। বাপিকে মেডিসিন খাইয়ে দুজন মিলে কফি খেতে খেতে
অনেক গল্প করে। মিম বাইরের দুনিয়ায় একরকম আর বাপির কাছে
আরেকরকম।
অন্যদিকে.....
মিসেস চৌধুরী অর্থাৎ যেই মহিলার গাড়ির সাথে মিম এক্সিডেন্ট
করেছে উনি অর্নীল চৌধুরীর আম্মু। অর্নীল বাসায় ফিরে দেখে
আম্মুর মাথায় ব্যান্ডেজ করা আর হাতেও ব্যান্ডেজ করা। অর্নীল
পাগল হয়ে যায় এইটা দেখে।
-আম্মু কি হয়েছে তোমার? মাথায় আর হাতে ব্যান্ডেজ কেন?
(আম্মুকে ধরে অর্নীল)
-আরে আব্বু কিছুনা। সামান্য কেটে গেছে।
-এইটা সামান্য? সিকিউরিটি? সিকিউরিটি? (জোরে জোরে ডাকছে
অর্নীল)
-জ্বি স্যার।
-ড্রাইভারকে ডেকে আনো তারাতারি।
-জ্বি স্যার।
-আব্বু কিচ্ছু হয়নি তুই এত হাইপার কেন হচ্ছিস?
-তুমি না সন্ধ্যায় বেরিয়েছিলে? সেখানে কি কিছু হয়েছে আম্মু?
বলছো না কেন? (অর্নীল পারেনা কেঁদে দেয়)
-জ্বি স্যার ডেকেছেন? (ড্রাইভার ড্রইংরুমে এসে)
-আম্মুর কি হয়েছে? আম্মুর মাথায় ব্যান্ডেজ কেন? তুমি না আম্মুকে
নিয়ে বেরিয়েছিলে? (ধমক দিয়ে অর্নীল)
-স্যার আসলে
এরপর ড্রাইভার অর্নীলকে সব বলার পর অর্নীল ভীষণ রেগে যায়
মেয়েটার উপর। অর্নীলের রাগ দেখে অর্নীলের আম্মু বলে,
-আব্বু জানিস মেয়েটা কে? তুই যে এত রাগ করছিস, বকাবকি করছিস
ওকে?
-আমি জানতেও চাইনা। আমার আম্মুকে ও কষ্ট দেয় কি করে?
(চিল্লিয়ে অর্নীল)
-আস্তে আব্বু। ও তো ইচ্ছে করে করেনি কিছু। ওই তো আমায় পরে
হসপিটালে নিয়ে গেলো। এরপর ওর গাড়ি করে বাসায় এ দিয়ে
গেলো। রাগ করিস না আব্বু৷
-আম্মু ওই মেয়ের সাহস হয় কি করে তোমার ড্রাইভারকে বলে যাতে
ও টাকা নিয়ে যায়। ওই মেয়ে কি আমার থেকেও বেশি রিচ? জেদ
উঠতাছে কিন্তু আম্মু আমার। কার্ড কোথায় দাও তো। (অর্নীল
ড্রাইভারের কাছে মিমের দেওয়া কার্ড চাইলো)
-এই যে স্যার।
-যাও এখন তুমি। মিম রায়হান? রায়হান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির মালিক?
(কার্ড দেখে অর্নীল অবাক হয়)
-এতক্ষণ তোকে এইটাই বোঝাতে চাচ্ছিলাম কিন্তু তুই বুঝলি না।
(আম্মু)
-শোনো আম্মু ওই ফালতু মেয়ের সম্পর্কে যা শুনি ততটুকুই ইনাফ। এর
বেশি কিছু শুনতে চাইনা আমি। (কার্ড ছিঁড়ে ফেলে অর্নীল)
-তুই ওকে ফালতু কেন বলছিস?
-কারণ ওর মতো উগ্র আর ওভারস্মার্ট মেয়ে এই দেশে আর দুইটা
আছে নাকি একমাত্র আল্লাহ জানে।
-তোকে কি করেছে?
-আমায় কেন কিছু করবে? আমি কখনো ওকে দেখেছি না ও আমাকে
দেখেছে?
-বাদ দে। মেয়েটা অনেক ভালো। আমার ভালই লেগেছে।
-ছিঃ
অর্নীল ছিঃ বলেই চলে যায়। অর্নীলের মা বুঝলো না অর্নীল কেন
এইভাবে বলল মিমকে? মিম মেয়েটা তো ভালই। অর্নীলের আম্মু
এসব বাদ দিয়ে ছেলের জন্য ডিনার রেডি করলেন। অর্নীল নিজে
খেলো আর আম্মুকেও খাইয়ে দিলো। এরপর নিজের ঘরে গিয়ে
কাজে মন দিলো অর্নীল। রাত তিনটা পর্যন্ত অফিসের কাজগুলো
করে ঘুমাতে যায় অর্নীল।
সকালবেলা রেডি হয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে যায় মিম। বাসা
থেকে অফিস দেড় ঘন্টার দূরত্বে। নিজেই ড্রাইভ করছে। অর্নীল ওর
আম্মুকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে বের হতে নেয় তখনি আবার পিছু ফিরে
আম্মুকে জিজ্ঞেস করে,
-তোমার ওষুধ কে কিনে দিয়েছে আম্মু?
-মিম।
-আর তুমি নিয়ে এলে? আম্মু তুমি অর্নীল চৌধুরীর মা অর্নীল
চৌধুরী। দাম কত হবে মেডিসিনগুলোর? হাজার বারশো? আজকেই ওই
মেয়েকে গিয়ে দিয়ে আসব আমি এই টাকাগুলো।
অর্নীল এই কথা বলে বেরিয়ে যায়। অর্নীল লাঞ্চ টাইমে যাবে
মিমের অফিসে।
Previous
Next Post »