মনের অন্তরালে পর্ব ০৩ ~ WriterMosharef

মনের অন্তরালে পর্ব ০৩

মনের অন্তরালে পর্ব ০৩
মনের অন্তরালে

অফিসে মিম সেইদিন সবার সাথেই যা নয় তা ব্যবহার করে। মিমের
মন প্রচন্ড খারাপ গত কালকের ঘটনার জন্য যা অর্নীলের সাথে
হয়েছে। কিন্তু কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলেনি। পরেরদিন অর্নীল
ভেবেছে অফিসে যাবেনা কিন্তু আকাশের একটার পর একটা ফোন
বাধ্য করলো অর্নীলকে অফিসে যেতে। একহাত দিয়ে কোনোরকম
ড্রেসাপ নিয়ে অর্নীল ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যায়। একহাত
দিয়েই ড্রাইভ করলো অর্নীল। অফিসে গিয়ে দেখে অনেকগুলো
ফাইল সাইন করতে হবে। অর্নীল তখন ভীষণ রেগে যায় আকাশের
উপর।
-এত আর্জেন্টলি আমায় অফিসে আনালে কেন? এইসব সাইন করতে?
(চিল্লিয়ে অর্নীল)
-স্যরি স্যার আসলে আমি জানতাম না আপনার হাতের অবস্থা
খারাপ। কিন্তু স্যার আপনি তো জানেন আর সপ্তাহ খানেক পর
আপনাকে ঢাকার বাইরে যেতে হবে একটা সেমিনারে আর সেই
কাজগুলোর ফাইনাল টাস্ক আজকে করেই জমা দিতে হবে। স্যরি
স্যার। (গলা নিচু করে অর্নীল)
-এখন বাম হাত দিয়ে আমি কিভাবে সাইন করব?
-স্যার হাত কি কেটে গেছে?
-হ্যা।
-তাহলে আমি কালকে পর্যন্ত সময় নিয়ে নেই ওনাদের থেকে।
কালকে পেপারস গুলো জমা দিয়ে দিব।
-হ্যা সেইটাই কর।
অর্নীল কেবিনেই নিজের চেয়ারে ধুম করে বসে পরে। কি হচ্ছে ওর
সাথে এসব? ওই মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে হাতটাই কেটে
ফেলেছে একদম। এক ঘন্টা অফিসে থেকে দুপুরের আগে বেরিয়ে
যায় অর্নীল। অর্নীল রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে শপিংমল থেকে
আম্মুর জন্য দুইটা শাড়ি কিনলো। অর্নীল আম্মুকে কিছু গিফট করতে
খুব ভালবাসে। অর্নীল শপিং থেকে বের হওয়ার সময় মিমকে
দেখলো মিমের পিএর সাথে। অর্নীলের শরীর পুরা লাল হয়ে যায়
রাগে। মিম সানগ্লাস মাথার উপরে তুলে দাঁড়িয়ে ছিলো আর
তাশিন মিমের সাথে কথা বলছে। তাশিন অর্নীলকে দেখে বলল,
-হাই চৌধুরী স্যার।
অর্নীল কোনো পাত্তা না দিয়েই গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে চলে
আসে। মিম এইটা দেখে মুচকি হাসে আর সানগ্লাস পড়ে
রেস্টুরেন্টে যায়।
-ম্যাম আপনি হাসছেন? উনি কেনো আমায় পাত্তা দিলো না?
(তাশিন)
-সেইটা তো উনিই বলতে পারবে তাইনা?
-এত ইগোইস্টিক মানুষ হয়না। এত অহংকার নিয়ে চলেন কেনো উনি?
ওনার থেকে আপনি কম কিসে? কই আপনি তো আমার সাথে কখনো
বাজে ব্যবহার করেন নি।
-এই ধারণা আমাকে নিয়ে করলে তুমি ভুল করবে? আমার সম্পর্কে
এসব ভাবলে তুমি আমাকে চিনোই নি।
-ম্যাম আপনি আসলেই খুব ভালো।
-বললাম না টাইম উইল সে। চলো মিটিংটা শেষ করি।
তাশিনকে নিয়ে মিম ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং শেষ করলো।
-ওকে মিস রায়হান নেক্সট উইকে দেখা হচ্ছে সেমিনারে। (মিস্টার
গোমেজ)
-হুম শিউর। কে কে যাচ্ছে আর? (হ্যান্ডশেক করে মিম)
-ঢাকা থেকে আপনি আর অর্নীল চৌধুরী যাচ্ছেন আর রাজশাহী
থেকে মিস্টার মির্জা। বাকিদের কথা আমি জানিনা।
-হোয়াট? কে যাচ্ছে? (হাইপার হয়ে মিম)
-কার কথা বলছেন ম্যাম? (তাশিন)
-অর্নীল চৌধুরী কেন যাবে? (দাঁত কটমট করে মিম)
-আমরা বেস্ট কাউকেই চাই। তাই অর্নীল চৌধুরী আর আপনাকে
সিলেক্ট করা হয়েছে ম্যাম। (মিস্টার গোমেজ)
-আই জাস্ট কান্ট বিলিভ দিজ! ওই ফালতু লোকটার সাথে এক সপ্তাহ
আমি সেমিনার করব? লাইক সিরিয়াসলি? (মাথায় হাত দিয়ে মিম)
-অর্নীল চৌধুরী কিন্তু খুব ভালো। তবে ইগো খুব বেশি। থাকা উচিৎ
কজ ইগো তো আপনাদেরকেই মানায়। (মিস্টার গোমেজ)
-যাওয়াটা ক্যান্সেল করতে চাই আমি। (মিম)
-ম্যাম প্লিজ এই মুহুর্তে এসে এই কথাটা বলবেন না। লন্ডনে
অলরেডি গেস্ট ইনভাইট করা হয়ে গেছে। তারা মেইনলি আসছে মিম
রায়হান আর অর্নীল চৌধুরীর জন্যই। এখন আপনি এই কথা বলবেন না
প্লিজ। একদম সব কিছু নষ্ট হয়ে যাবে। প্রায় এক কোটি টাকা
ইনভেস্ট করা হয়ে গেছে ম্যাম। (অস্থির হয়ে মিস্টার গোমেজ)
-হ্যা আমি বুঝতে পারছি। (মিম)
মিম ভেবে দেখলো অর্নীল চৌধুরীর জন্য ও কারো এত বড় ক্ষতি
করতে পারেনা। মিম যাবে। মিম ফাইনালি মিস্টার গোমেজকে
জানালো ও যাচ্ছে। মিস্টার গোমেজ খুব খুশি হয়।
-ম্যাম আরেকটা ইম্পর্টেন্ট নিউজ আছে।
-কি?
-লন্ডন আর কোরিয়া থেকে গেস্টরা আসছেন সো তারা কিছু
বাঙালিয়ানা দেখতে চেয়েছেন আপনার মধ্যে। আপনাকে বিদেশি
নারীর মতো দেখেছে বাট বাঙালি কালচারে দেখেনি তাই তাদের
ইচ্ছা সেভাবে দেখবে আপনাকে। জানি ব্যাপারটা একান্তই
আপনার কিন্তু বললাম।
-বাঙালি কালচার মানেই তো আপনাদের সেই শাড়ি আর গা ভর্তি
গহনা, ব্ল্যাক হেয়ার। আর এইসবে আমি অভ্যস্ত নই সো আই কান্ট ডু
দিজ।
-ওকে ম্যাম সমস্যা নেই। থ্যাংক ইউ এগেইন পাশে থাকার জন্য।
মিম সেখান থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে বসেছে আর তাশিন
বকবক করেই যাচ্ছে।
-ওহ তাশিন প্লিজ স্টপ। (জোরে ধমক দিয়ে মিম)
-ম্যাম স্যরি বাট আপনি চৌধুরী স্যারের সাথে আউটিং এ যাচ্ছেন?
-শুনলে তো সব। এরপরেও ফালতু কুয়েশ্চন কেন করছো? (গাড়ি স্টার্ট
করে মিম)
-স্যরি ম্যাম।
তাশিনকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে মিম বলে যায়
-চলে যাচ্ছি আমি। ম্যানেজারকে বলবে আমায় কল করতে।
-ওকে ম্যাম।
মিম সব ভাবনা বাদ দিয়ে বাসায় গেলো। যা হবে পরে দেখা
যাবে। উনি ওনার মতো থাকবে আর আমি আমার মতো। এতে
হেজিটেট করার তো কিছুই নেই আমার! অর্নীল এখনো জানেনা যে
মিম যাচ্ছে ওর সাথে। একবার যদি জানে তাহলে অর্নীলকে কেউ
সেখানে নিতে পারবেনা৷
ছয়দিন পর.....
রাতে মিমের ফ্লাইট বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। মিম সবার সাথে না
গিয়ে একাই গেলো আর অর্নীল ও একাই গেলো টিমের সাথে না
গিয়ে। মিমের বাপিকে মিম বলে এসেছে এক সপ্তাহ গুড বয়ের মতো
থাকতে আর ঠিকমতো খাওয়া, ঘুম আর মেডিসিন খেতে। সেইদিনই
মাঝরাতে মিম বান্দরবানে নামে আর ওর জন্য বুক করা হোটেল রুমে
গিয়ে উঠে। অর্নীল ভোরের আগে চলে আসে আর ও সোজা ওর রুমে
ঢুকে যায়। অর্নীল তখনো জানেনা মিম রায়হান এখানে।
পরেরদিন সকালে.....
-গুড মর্নিং ম্যাম। (মিমকে কল করে মিস্টার গোমেজ)
-ইয়াহ মর্নিং।
-ম্যাম নয়টার মধ্যে বের হতে হবে তো। ব্রেকফাস্ট করবেন না?
সবাই ওয়েট করছে আপনার জন্য।
-আসছি।
মিম তারাতারি রেডি হয়ে নিচে গেলো। অর্নীল পাশে বসে
বিভিন্ন ক্লায়েন্টদের সাথে কথা বলছিলো। মিমকে দেখে অর্নীল
টাস্কি খাবে নাকি রাগে ফাটবে সেইটাই বুঝতেছেনা।
-হোয়াট দ্য! এই বাদামী চুল এইখানে কি করে? (মনে মনে অর্নীল)
মিম অর্নীলকে দেখা সত্বেও কোনো পাত্তা দিলো না। অর্নীল ও
বিষয়টা আর ঘাটায় নি কারণ অনেক সিনিয়র রা এখানে বসে
আছেন।
অর্নীল মিমকে দেখতে পারেনা তার একটাই কারণ আর সেইটা
হচ্ছে মিম খুব বেশি স্মার্ট আর জেদি। মিমের ড্রেসাপ পুরো
ওয়েস্টার্ণ কালচারের যা অর্নীলের কোনো কালেই সহ্য হয়নি।
মিমের লুক ও বিদেশি মেয়ের মতো। মিমের বিহেভিয়ারও খুব
বাজে। এইসব কিছু মিলিয়ে অর্নীল কখনই দেখতে পারেনা মিমকে।
মিম আর অর্নীল পুরো বাধ্য হয়েই এক টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট
করলো আর রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলো টিমের সাথে। অর্নীল সারা
রাস্তা ফোন ইউজ করতে করতে এসেছে আর মিম ও তাই করেছে।
সেমিনারে জয়েন করে মিমের পরিবেশটা খুব ভালো লাগে। আর
যেই কাজে বা যেই জিনিসে মিমের মন বসে যায় সেই জিনিসে
একমাত্র ও কনসার্ন্ট্রেট করে। মিম বেশ এঞ্জয় করছিলো
লেকচারগুলো। অর্নীল চাইছেনা মিমের চেহারা দেখতে কিন্তু
বাধ্য হয়ে দেখতেই হচ্ছে।
-মিস রায়হান আপনাকে অন্য লুকে আশা করেছিলাম। (ইংলিশে
বলল একজন সিনিয়র)
-আমি যেইভাবে চলি সেইটাই আমার একচুয়াল লুক। সো আপনার
আশাটা ভাঙলাম আমি তার জন্য দুঃখিত। (ইংলিশে জবাব দিলো
মিম)
-নো প্রবলেম বাট হোপ সো ইউ উইল ট্রাই।
-মে বি।
মিম আর কথা বাড়ালো না। কারণ মিম জানে এই কাজ ওকে দিয়ে
মেরে ফেললেও সম্ভব নয়। বাঙালির এই ন্যাকা কালচার ওর কাছে
আজীবন ই ইউজলেস মনে হয়েছে।
Previous
Next Post »