মনের অন্তরালে পর্ব ০৫ ~ WriterMosharef

মনের অন্তরালে পর্ব ০৫

মনের অন্তরালে পর্ব ০৫
মনের অন্তরালে

অর্নীলের বাদামী চুলের ডাকে মিম বিরক্ত হয়ে গেলো। মিম
অর্নীলকে জিজ্ঞেস করলো,
-হোয়াট ডু ইউ মিন বাই বাদামী চুল? (পেছনে ঘুরে)
-বাদামী চুলকে তো বাদামীই বলা উচিৎ। আমি তো আর কালার
ব্লাইন্ড না। এনিওয়েজ, আপনার শাড়ির পেছনের অংশটা খুলে
মাটিতে লাগছে। সেইটা বলতেই এসেছিলাম।
অর্নীলের কথাটা শুনে মিম রাগী লুক নিয়ে তাশিনের দিকে
তাঁকালো।
-ম্যাম আমি সুন্দর করেই তো পরিয়ে দিয়েছিলাম। খুললো কি করে?
(ভয় পেয়ে তাশিন)
-আসলে কি বলুন তো ময়ুরের পাখনা লাগালেই তো কেউ কাক
থেকে ময়ূর হয়ে যায়না। আপনার ক্ষেত্রেও সেইটাই হয়েছে।
(অর্নীল)
-হাউ ডেয়ার ইউ? (দাঁত কটমট করে মিম)
-ডেয়ার আমি কিছুতেই করিনা। যা সত্য আর যা শুনতে তেতো সেসব
ই আমি বলি। চলি বাই।
অর্নীল মিমকে অপমান করে সেখান থেকে চলে এলো। মিমকে ও
কাক বলেছে? এই শাস্তি ওকে পেতেই হবে। তাশিন মিমের
শাড়িতে পিন লাগিয়ে দেয়। মিম চরম অপমান বোধ করছে। তাশিন
মিমকে বলল,
-ম্যাম অর্নীল স্যার কিন্তু খুব বেশি বারাবারি করছেন। একটা
লিমিট থাকা উচিৎ। ম্যাম আপনি ওনাকে কিছু না বলেই ছেড়ে
দিলেন?
-বলব বলেই তো চলে গেলো। এইভাবে আমায় কেউ কখনো বলার
সাহস করেনি আর এই লোকটা বারবার আমাকে অপমান করে চলে
যাচ্ছে। পেয়েছে টা কি? আমি দেখতে কি কাকের মতো? (মিম
পারেনা কেঁদে দেয়)
-নো ম্যাম। আপনি কেন কাক হতে যাবেন? এখন কাক বানাবো তো
চৌধুরীকে। (তাশিন)
-মানে?
-ম্যাম শুনুন.....
এরপর তাশিন যা বলার মিমকে বলে। মিম খুশি হয়ে বলে,
-একদম রিয়েল কাক হয়ে যাবে। তোমার মাথায় এসব বুদ্ধি থাকাটা
অস্বাভাবিক কিছুনা। যাও নিয়ে এসো তারাতারি।
তাশিন মিমকে বাই বলে চলে যায়। মিম ফোন ঘুরাতে ঘুরাতে বলে,
-অর্নীল চৌধুরী! ফেমাস বিজনেস টাইকুন। দেখা যাক আজকে
আপনার কি অবস্থা হয়। আমি আপনাকে মুখে মারবো না, কাজে
মারবো। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ। যেচে লাগতে এসেছিলেন তো!
তাশিন অনলাইনে অর্ডার করে একটা পার্মানেন্ট মার্কারের
কালির কৌটা আনালো। এখানে দোকান বেশ খানেক দূরে তাই
অনলাইন থেকেই আনাতে হলো। দুপুরে সবাই যখন লাঞ্চ করতে
বসলো তখন তাশিন অর্নীলের পিছু গিয়ে অর্নীলের পকেট থেকে
রুমাল বের করলো খুব সাবধানে৷ কালিগুলো রুমালে ঢেলে দিয়ে
রুমালটা ভাঁজ করে আবার পকেটে রেখে দিলো এরপর তাশিন পেছন
ঘুরে মিমের জায়গায় এসে বসলো। তাশিন এসে মিমকে বলল,
-ম্যাম ডান। এখন দেখেন ওনার কি অবস্থা হয়। (হাসতে হাসতে
তাশিন)
খাওয়া শেষ করে অর্নীলকে রুমাল বের করতে না দেখে তাশিন
বেশ অবাক সাথে মিম ও। অর্নীল ওইখান থেকে উঠে চলে যায়। আর
মিম, তাশিন পাহাড়ের পাশে একটা গাছের নিচে দাঁড়ায়। মিমের
ফোন তাশিনের হাতে।
-জায়গাটা কত সুন্দর তাইনা তাশিন? (মিম)
-হ্যা অনেক। কিন্তু ম্যাম অর্নীল স্যারের কি অবস্থা সেইটাই তো
এখনো দেখলাম না।
-এতক্ষণে ভূত সেজে ফেলেছে হয়ত! (হেসে দিয়ে মিম)
ওদের কথা বলার মাঝে অর্নীল পেছন থেকে তাশিনকে ডাক
দিলো,
-মিস তাশিন? (অর্নীল)
তাশিন ঘুরার সাথে সাথে অর্নীল রুমালটা তাশিনের গালে
লাগিয়ে দিলো আর তাশিনের পুরো মুখ কালিতে ভরে গেলো।
-এইসব কি? মিস্টার চৌধুরী আপনি এইটা কি করলেন? (রেগে গিয়ে
মিম)
-আপনার পিএ আমার সাথে যা করতে চেয়েছিলো সেইটা আমি
আপনার পিএর সাথে করলাম। টিট ফর ট্যাট। তবে আমাকে টিট করা
ওত সহজ নয় যতটা সহজ আপনার পিএ ভেবেছিলো। কি চিন্তা
আপনার? আমার পকেট থেকে রুমাল বের করবেন আর আমি টের
পাবো না? ইজ ইট পসিবল? (পকেটে হাত দিয়ে অর্নীল)
-স্যার কাজটা আপনি ঠিক করেন নি। কালিগুলো এখন আমি উঠাবো
কি করে? (কেঁদে দিয়ে তাশিন)
-কেন হারপিক অর্ডার করা লাগবে? (মুচকি হেসে অর্নীল)
-ম্যাম আপনি কিছু বলছেন না কেন? আমাকে এইভাবে কেন অপমান
করছেন উনি? (তাশিন)
-মিস্টার চৌধুরী আপনি আসলেই খুব বেশি বারাবারি করে
ফেলছেন। অনেক হয়েছে। ওকে স্যরি বলুন। (মিম)
-হোয়াট? অর্নীল চৌধুরী স্যরি বলবে? তাও এই মেয়েটাকে? আর ইউ
ওকেহ মিস রায়হান? (অর্নীল)
-আই এম এবসুলিউটলি ফাইন বাট আপনি ঠিক নেই।
-আমিও ঠিক আছি।
মিম এক সময় অর্নীলের সাথে তর্ক থামিয়ে দিয়ে তাশিনের দিকে
মনোযোগী হয়। তাশিন পানি দিয়ে কালি উঠানোর চেষ্টা করছে
কিন্তু উঠছেই না। অর্নীল পাশে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে আর হাসছে।
কিছুক্ষণ পর অর্নীল একটা মিনি প্যাকেট দেয় তাশিনকে
লাগানোর জন্য।
-অর্নীল চৌধুরী এতটাও খারাপ না ওকেহ? আমি কালি লাগিয়েছি,
আমিই উঠানোর ব্যবস্থাও করে নিয়ে এসেছি। এইটা লাগাও
তাশিন। উঠে যাবে। (অর্নীল)
-এইটাতে যদি বাজে কিছু থাকে। (তাশিন)
-ইঙ্ক রিমোভার লিখা আছে। দেখছো? (অর্নীল)
-আপনাকে আমি বিশ্বাস করছিনা স্যার। (তাশিন)
-সেইটা তো তোমার ব্যাপার তাইনা? একটু পর সবাই পাহাড়ে ঘুরতে
যাবে। তুমি যদি এই অবস্থায় যেতে চাও তাতে কারো কোনো
সমস্যা নেই।
-ম্যাম কি করব বলেন? (তাশিন)
-দেখি? (অর্নীলের থেকে প্যাকেটটা নিয়ে মিম) হ্যা লাগানো
যায় তাশিন। বাজে কিছু নেই। (মিম)
তাশিন ওইটা লাগানোর সাথে সাথেই কালি উঠে যায়। তাশিন
অর্নীলের দিকে তাঁকালো আর বলল,
-স্যার এইটা আগে কেন দিলেন না?
-আগে দিলে মজা নিতো কে? (মিম)
-এক্সেক্টলি! তোমার ম্যাম বুঝেছে। বুদ্ধিমতী ম্যামের মাথামোটা
পিএ। পার্ফেক্ট কম্বিনেশন। (অর্নীল)
-আচ্ছা স্যার আপনি আমাদের পিছু লেগেছেন কেন এইভাবে?
(তাশিন)
-আমি তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পেছনে নেই তো। (অর্নীল)
-আপনার সাথে কথায় পারা যাবেনা। পাহাড়ে না যাবেন চলুন।
(তাশিন)
-হ্যা বাট মিস রায়হান আপনি কি হাই হিল পরেই যাবেন? (অর্নীল)
-হ্যা কেনো?
-পরে যাবেন। স্লিপার পরা উচিৎ৷ পরে গেলে তো ইন্না-লিল্লাহ!
-পরব না।
-পরলে তো আপনি আছেন ই। (মনে মনে তাশিন)
অর্নীল এগিয়ে গিয়ে সবার সাথে কথা বলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই
সবাই ঘুরতে যাবে। অর্নীলের এডভেঞ্চারাস জার্নি খুব ভালো
লাগে। কিন্তু ও সময় পায়না তাই আসা হয়না। অর্নীল জুতা চেঞ্জ
করে ওয়াকিং শু পরে আসে। অর্নীল বসার জায়গায় পা রেখে
জুতার ফিতা বাঁধছিলো আর মিম তখনি ওই জায়গাটা ক্রস
করছিলো। মিমের শাড়ির সুতাগুলো অর্নীলের ঘড়ির সাথে লেগে
যায়। দুই পা এগিয়ে যাওয়ার পর মিম থেমে যায় টান লেগে। পেছনে
তাঁকিয়ে দেখে অর্নীলের ঘড়িতে মিমের শাড়ির সুতো লাগানো
আর অর্নীল ফিতা বাঁধায় ব্যস্ত।
-চোখে দেখেন না নাকি? সুতোটা ছাড়ান আপনার ঘড়ি থেকে। (মিম
সামনে এসে)
-শাড়ি আপনার, সুতো আপনার সো ছাড়াবেন ও আপনি। আমি কেনো
ছাড়াতে যাব ? আপনার বয়ফ্রেন্ড হই নাকি উডবি হাজবেন্ড?
-এই যে মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ ওকেহ? ঘড়িটা আপনার সো আপনিই
ছাড়ান।
-আবারো ভুল করছেন। আমার ঘড়ি তো আর লাগাতে যায়নি তাইনা?
আপনার শাড়ির সুতো যেচে এসেছে লাগতে তাই আপনিই ছাড়ান।
-ধ্যাৎ!
মিম টান দিয়ে সুতো ছিঁড়ে ফেলে আর সামনে এগিয়ে যায়।
অর্নীলের ঘড়িতে ছেঁড়া সুতোটা লাগানো। অর্নীল সুতোটা খুলে ফু
দিয়ে উড়িয়ে দেয়। সবাই যখন অর্নীলকে ডাকছিলো তখন অর্নীল
ওদের সামনে যায়। অর্নীল কথা বলতে বলতে হাঁটছিলো। মিম আর
তাশিন সবার সামনে। অনেকক্ষণ হাঁটার পর মিম দেখলো এখন ঢালু
বেয়ে উপরে উঠতে হবে। মিম দেখেই ভয় পেয়ে যায়।
-এনি প্রবলেম মিস রায়হান? (একজন সিনিয়র)
-ইয়াহ গ্রেট প্রবলেম। আমি এইখান দিয়ে যেতে পারব না। অনেক
ঢালু জায়গাটা। শিউর পরে যাব স্লিপ করে। আপনারা সবাই যান
আমি এখানেই আছি। (মিম)
-এইটা তো হয়না ম্যাম। আপনাকে একা রেখে আমরা এই জায়গা
থেকে তো যেতে পারবনা। পাহাড়ি অঞ্চল এইটা। (মিস্টার বেথ)
-বাট মিস্টার বেথ আই কান্ট ক্রস দিজ। (মিম)
-আপনারা যান আমরা আসছি৷ (অর্নীল)
-পারবেন তো স্যার? (মিস্টার গোমেজ)
-লেটস ট্রাই।
অর্নীল মিমকে বলে,
-হাতটা ধরুন যদি আপনার বয়ফ্রেন্ড বা আপনি কিছু মনে না করেন।
(হাত বাড়িয়ে দিয়ে অর্নীল)
-ও হ্যালো আই হ্যাভ নো বয়ফ্রেন্ড ওকে? সেই কখন থেকে শুনছি
বয়ফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড করে যাচ্ছেন। (মিম)
-এইসব অবিশ্বাস্য কথা বলার কোনো মানে নেই। হাত ধরুন।
-না আমি কখনো ধরব না আপনার হাত।
-এইখানে আপনাকে একা রেখে গেলে বড়সড় বিপদ হবে। কে কখন
কি করে ফেলে ঠিক নেই। তার চেয়ে ভালো আমার হাত ধরুন।
-ম্যাম প্লিজ আসুন৷ (তাশিন)
মিম কখনই কোনো ছেলের হাত ধরেনি বাপি ছাড়া। বিজনেস
পার্টনার দের সাথে হ্যান্ডশেক তো করেছে বাট এইভাবে হাত ধরা
তো হয়নি কখনো। মিম ইতস্তত করে হাত ধরলো অর্নীলের। বাকিরা
সবাই সামনে। মোট পনেরো জন এসেছে।
অর্নীল বেশ শক্ত করে মিমের হাত ধরে অল্প একটু জায়গা পার
করালো কিন্তু মিম ভয়ে কাঁপছে। পা ফসকে গেলেই খাঁদে পরে
যাবে৷ কিছুদূর যাওয়ার পর মিম ভয়ে কেঁদেই দেয়। মিমের কান্না
দেখে অর্নীল থামে। অর্নীল এইবার মিমের হাত ছেড়ে মিমের
পার্মিশন ছাড়াই মিমকে কোলে নেয়। সবাই পেছনে তাঁকিয়ে
দেখে ওরা কতদূর কিন্তু পেছনে তাঁকিয়েই সবাই অবাক হয়ে যায়।
মিম কাঁদছে আর অর্নীল মিমকে কোলে নিয়ে আসছে। মিস্টার বেথ,
মিস্টার গোমেজ, আর তাশিন ফোন বের করে ভিডিও করা শুরু
করলো। সবাই পাহাড়ের মাঝে যাওয়ার পর ওদের জন্য ওয়েট করে।
অর্নীল কিছুক্ষণ পর মিমকে এনে সমতল জায়গায় দাঁড় করালো।
অর্নীল ঘেমে শেষ।
-আরো যে কি কি দেখবো গড নোউস! মিম রায়হানের কান্নাও
দেখে ফেলেছি। শাড়িতে দেখলাম মিমকে। মিস রায়হান আরো
কিছু সারপ্রাইজ বাকি আছে কি? (অর্নীল)
-মজা নিচ্ছেন তাইনা? (এখনো কাঁদছে মিম)
-একটুও না।
-সারপ্রাইজ তো আমরা পেলাম অর্নীল। (মিস্টার বেথ)
-কিসের? (অর্নীল)
-তুমি মিমকে কোলে নিয়ে আসলা আর আমরা সবাই ভিডিও করলাম।
-স্যার এইটা কি হলো? একটা অসহায় নারীকে হেল্প করা আমার
কর্তব্য তাই করেছি। আর প্লিজ কাঁদবেন না আর মিস রায়হান।
নারীর কান্না আষাঢ়ের জলের মতো। (অর্নীল)
-আবার অপমান করছেন? (মিম)
-সত্যি কথা অপমানের মতই। চলুন উপরে যাই। এখন হাঁটতে পারবেন
নাকি আবার কোলে নিবো? (মুচকি হেসে অর্নীল)
অর্নীলের কথা শুনে সবাই হেসে দেয়।
-আমার সেমিনারটা স্বার্থক। ইগোইস্টিক অর্নীল চৌধুরী আর জেদি
মিম রায়হানকে একদমই আলাদাভাবে দেখছি। (মিস্টার গোমেজ)
-আসলেই স্বার্থক। (অর্নীল)
অর্নীল আগে আগে দৌঁড়ে উঠে যাচ্ছিলো আর সবাই হাঁপিয়ে
হাঁপিয়ে উঠছে। অর্নীল দৌঁড়ানোর সময় ওর চুলগুলো লাফাচ্ছিলো।
তাশিন মিমকে দেখিয়ে বলে,
-ম্যাম অর্নীল স্যারের চুলেও ক্রাশ খেয়েছি। কি করি বলুন তো?
-প্রপোজ করে ফেলো।
-উনি তো বিয়ে করবে কোটিপতি মেয়েকে। আমার মতো সাধারণ
মেয়েকে নাকি?
-তাহলে ক্রাশ খেয়েও লাভ নেই।
Previous
Next Post »