মনের অন্তরালে পর্ব ০৬ ~ WriterMosharef

মনের অন্তরালে পর্ব ০৬

মনের অন্তরালে পর্ব ০৬
মনের অন্তরালে

অর্নীল পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দম নেয়। মিম আর তাশিন পাহাড়ের
মাঝে বসে পরে। মিম তরতর করে ঘামছে। বাকিরা সবাই এগিয়ে
যাচ্ছে।
-ম্যাম আপনার জুতাগুলো আমায় দিন। আপনি খালি পায়ে হাঁটুন।
আরাম লাগবে। পাহাড়ী মাটিও পায়ে লাগবে।
-নো ওয়ে। আমি খালি পায়ে হাঁটতে পারব না।
-ম্যাম একটু হেটে দেখেন প্লিজ। ভালো না লাগলে আবার পরবেন।
-আরে পায়ে কাঁদা লেগে যাবে।
-লাগুক। তাও প্লিজ। আমি আর আপনি দুজনেই খালি পায়ে হাঁটবো।
দিন জুতো দিন।
তাশিন মিমের পায়ের থেকে জুতা খুলে নেয়। জুতা খুলে তাশিন
মিমকে ধরে উঠায় আর মিম এক পা দু পা করে হাঁটছে খালি পায়ে
এই প্রথম। মাটি অনেক ঠান্ডা। ভালই লাগছে মিমের। শাড়িটা
হাল্কা উঁচু করে মিম উঠে যায় পাহাড়ে। চূড়ায় গিয়ে শাড়িটা
ছেড়ে দেয় আর দেখে অর্নীল ঘাসের উপর বসে আছে।
-তাশিন জাস্ট লুক হিম। দেখে মনে হচ্ছেনা বেগার? (হাসতে হাসতে
মিম)
-মনের কথাটা বলেছেন ম্যাম। কিছু খুচরা থাকলে দিয়ে দিতাম।
(জোরে হেসে দিলো তাশিন)
মিম অর্নীলের বিপরীত দিকে দাঁড়ায় আর অফিসারদের সাথে
বিভিন্ন কথা বলছে। মিমের চুলের খোপা হালকা খুলে গিয়েছে
বলে আরো আকর্ষণীয় লাগছে ওকে। তাশিন কাঁদামাটি দেখে
আনন্দে শেষ। তাশিন জুতাগুলো হাত থেকে রেখে কাদামাটি তে
লাফানো শুরু করে। একটা লাফ দেওয়ার সাথে সাথে অর্নীলের
মুখে কাঁদা ছিটে যায়। অর্নীল রেগে গিয়ে উঠে সেখান থেকে।
তাশিনের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-হোয়াট ইজ দিজ? এইসব ছ্যাচড়ামো করছো কেন? কি করেছো
দেখো তো? (চিল্লিয়ে অর্নীল)
-স্যরি স্যার বুঝিনি আমি। এই নিন টিস্যু মুছে নিন। (অর্নীলকে
টিস্যু এগিয়ে দিয়ে তাশিন)
-হোয়াট রাবিশ! আমার কাছে টিস্যু নেই নাকি? (রেগে গিয়ে
অর্নীল)
-তো মুছুন গিয়ে। আর স্যরি স্যার।
-হোয়াটস রং উইথ ইউ মিস্টার চৌধুরী? একটু কাঁদাই তো লেগেছে।
এমন ভাব কেন করছেন? (সামনে এগিয়ে এসে মিম)
-একটু কাঁদাই তো লেগেছে তাইনা? (হাত ভাঁজ করে অর্নীল)
-হ্যা এর চেয়ে বেশি কিছু তো লাগেনি।
-ওকেহ।
অর্নীল নিচু হয়ে তিন আঙুলে লাগিয়ে একটু কাঁদা নিলো আর
মিমের বাম গালে সুন্দর করে কাঁদা দিয়ে আঙুলের ছাপ বসিয়ে
দিলো। মিম তো মুখ হা করে দাঁড়িয়ে আছে। মিমের চেহারা
দেখেই বোঝা যাচ্ছে প্রচন্ড রেগে আছে বাট হু কেয়ারস।
-এইটা আপনি কি করলেন? (দাঁত কটমট করে মিম)
-একটু কাঁদাই তো লেগেছে মিস রায়হান। এত রিয়েক্ট করার কি
আছে? আপনার মুখেও কাঁদা আর আমার মুখেও কাঁদা। বেশ তো
লাগছে। (মুচকি হেসে অর্নীল)
-ইউ জাস্ট আনটলারেবল।
মিম রেগে চলে যায় অপর পাশে। টিস্যু দিয়ে কাঁদা মুচছে আর
রাগে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাশিন রীতিমতো শকড। কি
হলো এইটা। অন্যান্য সবাই বলছে আসার পর থেকে অর্নীল আর
মিমের ঝগড়াই দেখছি।
মিম কাঁদা মুছে তাশিনকে বলে,
-চলো তাশিন। আমি চলে যাব। আজকেই ঢাকা ব্যাক করব। (মিম)
-কি বলছেন ম্যাম? ঢাকা ব্যাক করবেন মানে? ম্যাম আরো পাঁচদিন
বাকি সেমিনারের। (মিস্টার গোমেজ)
-এই অসভ্য লোকটার সাথে আর পাঁচ মিনিট আমি থাকতে পারবনা
আর পাঁচ দিন তো অনেক দূরের কথা। (অর্নীলের দিকে আঙুল তুলে
মিম)
-এক্সকিউজমি কে অসভ্য? (অর্নীল)
-ইউ জাস্ট শাট আপ! (অর্নীলকে ধমক দিয়ে মিম)
-করলাম চুপ বাট রাস্তা তো একটাই এখান থেকে যাওয়ার। আর সেই
খাঁদটাই পার হতে হবে আপনাকে৷ যদি পারেন তো যান।
-হ্যা যাচ্ছি। তাশিন চলে এসো।
মিম সন্ধ্যার সময় রেগেই সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। সাথে সাথে
তাশিন ও যায়। অর্নীল ভালো করেই জানে ওই জায়গা পার হওয়া
মিমের কর্ম নয় কারণ আসার সময় কেঁদে রেধে এক করে
ফেলেছিলো। বাকি সবাইরা বলছে,
-অর্নীল এই সন্ধ্যায় মিম একা একা বেরিয়ে গেলো। জায়গাটা
কিন্তু খুবই ভয়ানক। (সিনিয়র অফিসার)
-হুম স্যার আপনারা আসুন। আমি দেখছি। (অর্নীল)
অর্নীল মুখের কাঁদা মুছতে মুছতে পাহাড় থেকে নেমে আসে।
পাহাড় থেকে অর্নীল এত দ্রুত আসে যে ওদের দেখতে পাওয়ার
কথা কিন্তু এই ঘন অন্ধকারে অর্নীল ওদের কাউকেই দেখতে
পারছেনা। অর্নীল ভয় পেয়ে যায়। অর্নীল মিম বলে চিৎকার করে
ডাকলো কিন্তু তার প্রতিধ্বনি ও ই শুনতে পেলো কিন্তু কোনো
সাড়া এলো না। অর্নীল এইবার নিজের প্রতি নিজে রেগে যাচ্ছে।
কেন ওদের তখন আটকালো না? অর্নীল ওই ঢালু জায়গাটা পাড় হয়েই
মাটিতে পরে থাকা মিমের চুলের খোপার ফুলের উপর পা রাখে।
ফোনের ফ্ল্যাশ দিয়ে অর্নীল দেখে মিমের চুলের সেই ফুলটা। আর
পাশে মিমের একটা জুতা। অর্নীল চোখ বন্ধ করেই বলে,
-ওহ শিট! মিম? তাশিন? কোথায় তোমরা? মিইইইইইইম? (খুব জোরে
ডাকছে অর্নীল)
-অর্নীল স্যার? (খুব কাছ থেকে চিৎকার করে ডাকলো তাশিন)
-তাশিন তোমরা কোথায়? (পিছু দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে অর্নীল)
অর্নীল আর কোনো আওয়াজ না পেয়ে এইবার সত্যিই ভয় পেয়ে
যায়। অর্নীল ওর ইচ্ছেমতো এগিয়ে যাচ্ছে আর পাতার আওয়াজ
করছে। অর্নীল হঠাৎ থেমে যায় আর পাতার কিছু আওয়াজ ফলো
করে পশ্চিম দিকে ফোনের ফ্ল্যাশ অফ করে টার্ন নিতে থাকে।
কিছুক্ষণ যাওয়ার পর অর্নীল দেখলো একটা বড় গাছের নিচে টেন্ট
টানানো আর তাশিন মিমকে একসাথে বেঁধে বসিয়ে রেখেছে ৪/৫
জন লোক। অর্নীল দেখলো মিমের শাড়ির ঠিক নেই। এইসব দেখে
অর্নীলের মাথায় রক্ত উঠে যায়। ওরা দুইজনই কাঁদছে। অর্নীল ফোন
পকেটে ঢুকিয়ে সোজা ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আগুন
জ্বলছিলো শুকনো কাঠ দিয়ে। অর্নীল সেখান থেকে একটা জ্বলন্ত
কাঠ তুলে সবগুলোকে ইচ্ছেমতো পেটাতে থাকে। সবার শরীর পুড়ে
যাচ্ছে।
-বাস্টার্ড! এইখানে কি তোরা এইসব করার জন্যই আছিস? লজ্জা
করেনা মেয়েদের গায়ে এইভাবে হাত দিতে? (উলটো হাতে কতগুলো
চড় মেরে অর্নীল)
ওর শার্টের কলার ধরেই অর্নীল ফোন বের করলো আর লোকাল
পুলিশকে ইনফর্ম করলো। আধা ঘণটা পর পুলিশ আর সিকিউরিটি
এসে ওদের নিয়ে গেলো।
-এনাফ সেফটি দিতে পারলে সিকিউরিটি রাখবেন নচেৎ কোনো
প্রয়োজন নেই। এইটা একটা টুরিস্ট স্পট। আপনাদের উচিৎ না
এইখানে ইনাফ সিকিউরিটি রাখা? আজ যদি ওদের কিছু হতো তো
এর দায়ভার কি আপনারা নিতেন? (ভীষণ রেগে যায় অর্নীল)
-স্যরি স্যার। জায়গাটা খুব ডেঞ্জারাস তাই এইখানে কেউ থাকতে
চায়না। আমরা চেষ্টা করব। (পুলিশ অফিসার)
-জাস্ট গো।
পুলিশ চলে যাওয়ার পর অর্নীল মিমের আর তাশিনের বাঁধন খুলে
দেয়। বাঁধন খোলার সাথে সাথেই মিম মাটিতে পরে যায়। অর্নীল
মিমের মুখে পানি দিবে সেইটাও নেই এখানে। অর্নীল মিমের
গালে ধরে ঝাকায় কিন্তু কোনো রেসপন্স নেই।
-স্যার ম্যামের কি হলো? (কেঁদে দিয়ে তাশিন)
-সেন্সলেস হয়ে গেছে। তুমি ওর শাড়ি ঠিক কর তো। ওকে কোলে
নিয়ে যেতে হবে। জ্ঞান ফেরানোর কোনো ওয়ে নাই।
অর্নীল ওই কথাটা বলেই পিছু ঘুরে যাতে তাশিন মিমের শাড়ি ঠিক
করতে পারে। এরপর অর্নীল মিমকে কোলে নিয়ে ৩৫০ মিটার রাস্তা
হেঁটে এরপর হোটেলে আসে। মিমের ঘরে অর্নীল মিমকে ওর
বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পানি ছিটা দেয়। মিম কিছুক্ষণ পর চোখ
খুলে তাঁকায়। অর্নীলকে সবাই কল করছে কি অবস্থা জানার জন্য
কিন্তু অর্নীল ফোন পিক না করে টেক্সট করে দেয়।
-ঠিক আছেন এখন? (অর্নীল মিমকে জিজ্ঞেস করলো)
-মিম চুপ ছিলো।
-দেখুন আমি এই জীবনে কাউকে যেইটা বলিনি তা আপনাকে বলছি
"স্যরি"। আমি বুঝিনি একটু মজা করার জন্য এত বড় কিছু হয়ে যাবে।
রিয়েলি স্যরি। (অর্নীল মুড অফ করে)
-স্যার আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার জন্যই আমরা স্বাভাবিকভাবে ওই
খান থেকে ফিরে আসলাম। আমি স্যরি আপনার সাথে কত মজা
করেছি তাই।
-ইটস ওকে। চেঞ্জ করে নাও৷ আসছি আমি।
অর্নীল সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ঘরে গিয়ে শুধু মিমের
ওই দৃশ্যটার কথাই ভাবছে। মিমের শাড়ি এলোমেলো হওয়া দেখে
অর্নীল এতটা রেগে গেলো কেন? অর্নীল মাথা নিচু করে খাটে
বসে আছে পা ফ্লোরে রেখে। অর্নীল মনে মনে বলল,
-মিমকে তো আমি দেখতে পারিনা তো ওর যা ইচ্ছে হোক তাতে
আমার কি? আমি কেন ডেস্পারেট হয়ে গিয়েছিলাম ওকে ওইভাবে
দেখে? আজকে যেইভাবে ছেলেগুলোকে মারলাম ওইভাবে তো
আমি কখনো কাউকে মারিনি। ডিজগাস্টিং! কি হলো এইটা? আবার
স্যরি ও বললাম মিমকে!!
অর্নীল খাটে বসে এসব ভাবছে আর কিছুক্ষণ পরেই ফ্রেশ হতে যায়।
Previous
Next Post »