মনের অন্তরালে পর্ব ০৭ ~ WriterMosharef

মনের অন্তরালে পর্ব ০৭

মনের অন্তরালে পর্ব ০৭
মনের অন্তরালে

অর্নীল রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বসেছিলো। ফোনে স্ক্রলিং করতে
করতে মিস্টার গোমেজ কল করলো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার
জন্য। অর্নীল রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায়। মিমকে সেখানে না
দেখে তাশিনকে জিজ্ঞেস করে,
-তোমার ম্যাম কোথায়?
-ঘুমিয়ে আছে।
-ডিনার করবেনা?
-না।
-এখন ঠিক আছে?
-হুম। আপনার জন্যই ঠিক আছে।
অর্নীল ডিনার করে আবার নিজের ঘরে চলে যায় আর মায়ের সাথে
স্কাইপিতে জম্পেশ আড্ডা দেয়। অর্নীলের মা তখন হঠাৎ
অর্নীলকে বলে,
-অনলাইনে তোর ফ্যান ক্লাবের রিসেন্ট স্ট্যাটাসগুলো চেক
করেছিস? (মুচকি হেসে অর্নীলের আম্মু)
-না। কেন?
-চেক কর। করে এরপর আমায় কল দে।
অর্নীল কল কেটে দিয়ে ফেইসবুকে আর ইউটিউবে মিম আর
অর্নীলকে নিয়ে অনেকগুলো ভিডিও পায়। সবগুলো ভিডিও ই
কোলে নেওয়ার ভিডিওটা তবে ক্যাপশন গুলো আলাদা। ক্যাপশন
পরে অর্নীল রাগ হবে কি? হাসতে হাসতে শেষ। অর্নীল কিছুতেই
পারছেনা হাসি থামাতে। হাসতে হাসতে অর্নীল ওর আম্মুকে ফোন
দেয়।
-কিরে এইভাবে পাগলের মতো হাসছিস কেন? (অর্নীলের আম্মু)
-লাইক সিরিয়াসলি আম্মু? ওই মেয়ে আমার লাইফ পার্টনার হওয়ার
যোগ্য? এইসব কি বলে পাবলিক?
-কোলে কখন নিয়েছিস?
-মিম খাঁদ পার হতে পারছিলো না। আমি জাস্ট হেল্প করেছি। ব্যস।
আর এইভাবে আমার লাইফ পার্টনার, হ্যান ত্যান বানিয়ে ফেলবে
মানুষ সেইটাই তো ভাবিনি।
অর্নীল এইটা নিয়ে ভীষণ মজা করে ওর আম্মুর সাথে। অর্নীলের
আম্মুও বলে,
-এত হেসো না। মিমের মতই কাউকে পাবা তুমি। সো কন্ট্রোল।
-তুমি থামো আম্মু। ওই মেয়ের ছায়ার মতো ও কাউকে দেখতে
চাইনা। কিন্তু আম্মু একটা সত্যি কথা কি জানো?
-কি?
-মিমকে শাড়ি পরলে কিন্তু দেখার মতো লাগে। আজকে দেখলাম।
তুমি ভাবতে পারবেনা জাস্ট স্পিচলেস হয়ে গিয়েছিলাম।
-হ্যা আমিও দেখেছি। খুব সুন্দর লাগে তো।
অর্নীল ওর আম্মুর সাথে অনেক রাত পর্যন্ত ফাজলামো করে এরপর
বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কফি খায় আর খেয়ে ঘুমিয়ে যায়।
সকালে মিম ব্ল্যাক শার্ট আর হোয়াইট প্যান্ট পরে ফিল্ড এ আসে।
চুলগুলো মাঝে সিঁথি করে খোলা আর ঠোঁটে হালকা পিঙ্ক রঙের
লিপস্টিক। মিমের শার্টের হাতা হাল্কা ভাঁজ করা আর কলার ও
সুন্দর করে ভাঁজ করা। মিম পকেটে হাত রেখে তাশিনের সাথে কথা
বলছে আর হাঁটছে। তাশিনের হাতে প্রজেক্টের পেপারস ছিলো।
মিম সেগুলো কমপ্লিট করে খসড়াগুলোই তাশিনকে দিয়ে
তোলাচ্ছিলো। মিম আর তাশিন মাঠের মাঝে দাঁড়ানো আর
মিস্টার বেথ ওদের সামনে গিয়ে বলেন,
-আর ইউ ওকে মিম?
-ইয়াহ স্যার। (মিম)
অর্নীল ও দ্রুত হেঁটে ফিল্ডে আসছিলো আর মিমকে দেখে আবার দুই
পা পেছায়। মিমের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-কেমন আছেন? (অর্নীল)
মিম একটাবার তাঁকালো ও না অর্নীকের দিকে। ও এমন ভাব
করেছে যে শুনতেই পায়নি। অর্নীলের খুব অপমান বোধ হলো আর ও
সেখান থেকে চলে গেলো। প্রজেক্ট কমপ্লিট করে মিম সবার
সামনে যায়। মিম নিজ হাতে সেইটা সবাইকে সাবমিট করে।
-এইটা আমার পেপার। আমার সব কাজ শেষ এখানকার। দুপুরেই আমি
ঢাকা চলে যাচ্ছি। (মিম)
-কিভাবে সম্ভব? সাতদিনের কাজ একদিনে? (অবাক হয়ে সবাই)
-পেপারস গুলো চেক করুন এরপর বলুন ঠিক আছে কি না। (মিম)
অর্নীল একটু দূরে দাঁড়ানো। ও বুঝেছে কালকের ঘটনার জন্য মিম
ভীষণ খ্যাপা তাই সাতদিনের কাজ একদিনে করেছে। অর্নীল বেশি
ভাবেনি আর। মিমের প্রজেক্ট ওয়ার্ক ঠিক আছে বলে মিম দুপুরেই
তাশিনকে নিয়ে ঢাকায় ব্যাক করে। । অর্নীলের কোনো মাথা
ব্যথা নাই এ নিয়ে। মিম চলে আসার পর সবাই খুব ডিস্টার্বড।
অর্নীল ই শুধু নিজের মতো চলেছে। অর্নীল যে খুব খুশি তা নয় কিন্তু
অখুশি সেইটাও নয়।
দশদিন পর.....
পুরো টিম বান্দরবান থেকে ঢাকায় চলে আসে তিনদিন আগেই। সবাই
মিমের সাথে দেখা করে যে যার যায়গায় চলে যায়। অর্নীল শুধু
যায়নি মিমের অফিসে। অর্নীল ঢাকায় এসে নিজের অফিসে যায়
আর এর মাঝে যা হয়েছিলো সবই ভুলে গিয়েছিলো কিন্তু হঠাৎ
মিমের সাথে অর্নীলের আবার দেখা হয়ে গেলো। অর্নীল একটা
কাজে বনানী কবরস্থান পার করে যাচ্ছিলো। সেখানে মিমকে
সাদা গাউন আর সাদা হিজাব পরা দেখে অর্নীল অনেক বেশি
চমকে যায়। অর্নীল গাড়ি ব্যাক করে দাঁড় করায়। মিমের চেহারা
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। পাশেই মিমের গাড়ি দাঁড় করানো। মিমকে
এইভাবে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে অর্নীল বাকরুদ্ধ
হয়ে যায়। অর্নীল গাড়ির গ্লাস খুলে এরপর সানগ্লাস খুলে দেখে
মিমকে। কিছুক্ষণ পর মিম কাঁদতে কাঁদতেই গাড়িতে বসে চলে
গেলো। তখন সন্ধ্যা নামবে।
অর্নীল ও মিমের পিছু পিছু চলে এলো। সারারাস্তা অর্নীল
ভেবেছে এইভাবে কেউ কবরে দাঁড়িয়ে কাঁদে? মিম কার জন্য
কাঁদে? তাও দুইটা কবর একপাশে ছিলো। দুইটা কবরেই ও দোয়া
করলো। অর্নীল ভাবতে ভাবতেই নিজের কাজের স্থানে চলে আসে
আর কাজ শেষ করে বাসায় যায়। বাসায় গিয়ে অর্নীল ভাবে,
-মিমের ব্যাপারটা ভালভাবে জানতে হবে। একটা মেয়ে কবরে
গিয়ে এইভাবে কাঁদে নাকি? তাও দুইটা কবর।
অর্নীল জানে যে মিমের আম্মু নেই। যদি একটা আম্মুর কবর হয় তো
আরেকটা কার? অর্নীল আপাতত ব্যাপারটা বাদ দিয়ে নিজের
কাজে মনোযোগ দেয়। অর্নীল পরেরদিন ইচ্ছে করেই কবরস্থানে
গেলো দেখার জন্য যে মিম আসে নাকি প্রতিদিন? কবরস্থানে
গিয়ে দেখলো একটি কবরে লেখা ইশিতা চৌধুরী আরেকটি কবরে
লেখা নাহিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে দুইজনের মৃত্যু
একইদিনে আর দুই মিনিট আগে পরে। অর্নীল ভেবেছে হয়ত মিমের
ভাই হবে। মিমের গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অর্নীল সেখান থেকে চলে
যায় আর মিমকে আগেরদিনের মতো কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করতে
দেখে। অর্নীল সেইদিন বাসায় এসে তাশিনকে ফোন দেয়।
-তাশিন আমি অর্নীল চৌধুরী।
-স্যার আসসালামু আলাইকুম। বলুন। (তাশিন)
-তোমার ম্যাম প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে কোথায় যায় জানো?
-হ্যা জানি। (মন খারাপ করে তাশিন)
-কোথায়?
-কবরস্থানে।
-কেন যায়?
-আন্টি আর ভাইয়ার কবর যিয়ারত করতে।
-মিমের ভাই ছিল?
-না। ম্যামের বয়ফ্রেন্ড ছিল।
-হোয়াট? তাহলে নাহিল নামের কেউ মিমের বয়ফ্রেন্ড ছিলো?
(অবাকের চরম সীমায় অর্নীল)
-হ্যা। কেনো স্যার?
-নাহিল মারা গেলো কি করে তাহলে? আর ইশিতা চৌধুরী তো
মিমের আম্মু তাইনা?
-হ্যা। আর নাহিল ভাইয়া আর আন্টি একদিনে একই ক্ষণে মারা যায়।
-কিভাবে?
-অনেক কাহিনী। শুনলে কান্না আটকে রাখতে পারবেন না স্যার।
তবুও বলছি..........
"Flashback"
ম্যাম ২০১৫ তে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে পার্মানেন্টলি চলে
যসে। ম্যামের বয়স তখন ১৯. অনেক বেশি স্মার্ট আর সুন্দরি ছিলেন
তিনি। ম্যাম যখন বাংলাদেশ ঘুরাঘুরি শুরু করলো তখন একটা ছেলের
সাথে ম্যামের খুব ভালো ফ্রেন্ডশিপ হয়ে যায়। ছেলেটা সাউথ
এরিয়ার। নাহিল ভাইয়াই সেই ছেলে। ম্যামের ও ভীষণ ভালো
লাগে নাহিল ভাইয়াকে। ম্যাম যেদিন নাহিল ভাইয়াকে নিয়ে
বাসায় আসে সেইদিন আন্টি আর আংকেল ভূত দেখার মতো চমকে
যায়। ওনাদের মেয়ে কোনো ছেলেকে নিয়ে বাসায় আসবে সেইটা
সমস্যার ছিলো না কিন্তু সমস্যা হলো যখন ম্যাম বলেছিলো নাহিল
ভাইয়াকে সে ভালবাসে। ১৯ বছরের মেয়ে কতটুকুই আর বুঝে?
রায়হান স্যার ম্যামকে অনেক বুঝিয়েছিলেন যে নাহিল ভাইয়ার
কথা ভুলে যেতে। কিন্তু ম্যাম পারেনি উলটো আন্টির সাথে অনেক
বাজে ব্যবহার করতো। ম্যাম আরো অনেক বেশি জেদি আর একগুয়ে
ছিলো। ম্যামের জন্য নাহিল ভাইয়াও পাগল ছিলেন। ভাইয়াকে
রায়হান স্যার মেনে নেয়নি তার কারণ তাদের মতো অর্থ ছেলের
নেই,ছেলের কোনো ক্লাস নেই। সাধারণ একজন ছেলে ছিলো
ভাইয়া। ম্যাডাম ও সেই জেদ নিয়ে বসে আছে যে উনি বিয়ে করলে
নাহিল ভাইয়াকেই করবে।
Previous
Next Post »