বিদায় বেলার শেষ কথা ~ WriterMosharef

বিদায় বেলার শেষ কথা

বিদায় বেলার শেষ কথা, বিদায় বেলার স্ট্যাটাস, বিদায় বেলার গল্প, বিদায় স্ট্যাটাস, বিদায় বন্ধ, বন্ধু বিদায় স্ট্যাটাস, বিদায় status, বিদায় বেলা, বিদায় বেলার কথা, বিদায় বেলার কিছু কথা, Goodbye Bella's last words, short story, WriterMosharef

Hi I'm WriterMosharef

আমি আজও বইটা হাতে নিতে নিতে এদিক ওদিক তাকালাম। ব্যাস্ত এ শহরের কোন কিছুই স্থির নেই।

দিনশেষে এ বই মেলাতেও ব্যস্ততা। এক স্টল থেকে অন্য স্টল। এ বই থেকে সে বই। এটা নটা লেগেই আছে ব্যস্ততা। কিন্তু আমার কোন তাড়া নেই।

আমি বইয়ের প্রথম মলাট উল্টাতে উল্টাতে স্টলের ভেতর দাড়ানো তেইশোর্ধ এক মেয়েকে একটু দ্বীধা নিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করি,

আচ্ছা, আজ আপনার পাশের জনকে দেখছি না যে?
আমার কথায় মেয়েটা কিছু বলে না।চুপ করে থাকে।মেয়েটা আরও কিছুক্ষন চুপ থেকে মুচকি হেসে বলে,
কে, ফাইজা?

মেয়েটার কথায় আমি মাথা নাড়িয়ে জানান দেই,হ্যা ফাইজা। মেয়েটা একটু চুপ থেকে বলে, ওর ভার্সিটি তে কিছু কাজ আছে।তাই আজ আসতে পারেনি। হয়তো
সামনের দু দিন ও আসতে পারবে না।

মেয়েটার কথায় আমি চুপ করে থাকি। ভার্সিটিতে কাজ থাকলে সেটা সকালে নয়তো দুপুরে সেরে ফেলবে। এ
বিকেল গড়িয়ে সন্ধা হয়ে গেছে। এই সন্ধাতেও ভার্সিটিতে কাজ থাকে নাকি! আমি আরও একটু চুপ থেকে মেয়েটার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলি,

উনি কোন ভার্সিটিতে পড়েন?

আমার কথায় মেয়েটা এবার আর হাসে না।তাকায় আমার দিকে।

অবাক চোখে।এর মাত্রা আরও কিছুক্ষন থাকে।আমি আবারও বলি,

নামটা জানেন?

মেয়েটা এবারও কিছু বলে না।চুপ করে থাকে। আমি হাতে রাখা বইটা রাখতে রাখতে এদিক ওদিক তাকাই।মেয়েটার পাশে আরও একজন ছেলে দাড়িয়ে আছে।

আমার কথায় যে ইনিও বেশ অবাক হয়েছেন সেটা ওনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আমিই বুঝলাম
না, এতে অবাক হওয়ার কি আছে।মেয়েটা আরও কিছুক্ষন চুপ থেকে আস্তে করে ভার্সিটির নাম বলতেই আমি আর দাড়ালাম না। হাটা দিলাম। বাসার উদ্দেশ্যে।

অবশ্য ফাইজা আমাকে এখানে আসতে একদম বারন করে দিয়েছিল। হয়তো মেয়েটা আমাকে আজ এখানে
দেখলে বেশ রেগেই যেত।কিন্তু মেয়েটার আজ দেখা নেই।

দিনটা ছিল মঙ্গলবার। নামের সাথে এর ব্যাবহারও বেশ ভাল হওয়া উচিত ছিল। তবে সেটা হয়েছে কি না আমার জানা নেই। অফিস শেষে এই ক্লান্ত বিকেল আমার কাছে বোঝা স্বরূপ। বারবার মনে হয়, অফিসটাই ভাল ছিল। সময় কেটে যেত।

শফিক সাহেব।আমার কলিগ। আমার অবস্থা বুঝতে পেরে লোকটা আমাকে বেশ কয়েকবার ওনার বাসায় যেতে বলেছিলেন। আড্ডা হবে, সময় কাটবে। কিন্তু আমি যাইনি। শফিক সাহেব তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়েই থাকেন। ওনাদের নতুন বন্ধনের ভালবাসার
খুনশুটিগুলা দেখলে আমার মনটা আরও খারাপ হয়ে যাবে। দ্রুত বিয়ে করতে ইচ্ছে হবে। পাত্রী খুজতে হবে।পছন্দ হবে আবার হবে না। বেশ ঝামেলা।আমি এ ঝামেলায় জড়াতে চাই না।

লোকটা আমাকে আর ওনার বাসায় যেতে বলেন না।উনি এখন বলেন বই পড়তে। এতে নাকি সময় ও কাটবে, ভালও লাগবে। সেই সুবাদে আমার বইমেলায় আসা।আমি ঘুরি,এ স্টল থেকে ওই স্টল।কিন্তু আমার
বই পছন্দ হয় না। হবে কিভাবে! উপরের মলাট দেখে তো আর ভেতরটা চেনা যায় না।অবশ্য আমি যে খুব একটা বই পড়ুয়া সেটাও না। আমার মনে নেই আমি কবে গল্পের বই পড়েছি। আমি হাটতে হাটতে অন্য
একটা স্টলের সামনে গিয়ে দাড়াই। আশেপাশের স্টলগুলোর চাইতে এটাতে কিছুটা ভীড় কম।

আমি সাজিয়ে রাখা বইগুলোর মাঝে থেকে একটা বই হাতে নিতেই সামনে দাড়ানো মেয়েটা আমার দিকে একটা বই এগিয়ে দিতে দিতে বললো, ভাইয়া, এই বইটা দেখুন। ভাল লাগবে।

মেয়েটার কথায় আমি মাথা তুলে তাকাই। মুচকি হাসিটা মেয়েটার মুখে এখনও লেগে আছে।কিন্তু আমি এই হাসিতে আটকে যাই না।

আমি আটকে যাই ওনার পাশে দাড়ানো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে।

আহা।কি সুন্দর ভাবেই না কথা বলছে বইপড়ুয়াদের সাথে। সাথে হাত নাড়ানোটা আমাকেও বেশ নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমার জায়গায় কোন লেখক বা কবি দাড়িয়ে থাকলে নিশ্চিত এই মেয়েটাকে দেখেই শ খানেক কবিতা লিখে ফেলতেন। সাথে লেখকের হাজার
হাজার শব্দের উপন্যাস।

আমি সম্বিত ফিরে পাই মেয়েটার ডাকে।বইটা নেবো কি না?

প্রশ্নে আমি কিছু বলি না। চুপ করে থাকি। আজ বইটা নিলে কাল কোন ছুতোয় আমি আসবো সেটা ভাবতে থাকি। কিন্তু আমার এই অলস মস্তিষ্কে কোন ভাবনার উদয়ন ঘটে না। আমি আর দাড়াই না।

এরপর প্রায় প্রতিদিনই অফিস শেষে আমি গিয়ে দাড়াই সেই স্টলের সামনে। বইটা হাতে নেই। এদিক ওদিক দেখার ভান করে তাকিয়ে থাকি মেয়েটার দিকে। বই হাতে তাকিয়ে থাকলে ধরা পড়ার ভয় থাকে না। কিন্তু মেয়েটা আমাকে ধরে ফেলে। কিছু বলে না। মুচকি হাসে।যে হাসিতে আমি হারিয়ে যাই। তবে বেশিক্ষন
থাকতে পারি না। ফিরে আসি মেয়েটার ডাকে। আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,

আপনি যে কদিন হলো স্টলে আসছেন, বই দেখছেন, প্রতিদিন দুইটা করে বই কিনলেও স্টলের প্রত্যেকটা বই কেনা হয়ে যেত। কিন্তু, আপনি করছেন উল্টোটা। হয়তো বই দেখার ছলে অন্যকিছু।

মেয়েটার কথায় আমি কি বলবো ভেবে পাই না।অবশ্য খারাপ কিছু বলেনি। আমি একটু চুপ থেকে বলি,
আপনি তাহলে প্রত্যেকটা বইয়ের একটা করে দিয়ে দেন।

আমার কথায় মেয়েটা কিছু বলে না।ভ্রু কুচকে তাকায় আমার দিকে।

আমি সে তাকানোয় এবার আর হারাই না।আবারও বলি, কোই দিন।

বইগুলা হাতে নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। এতগুলা বই দিয়ে আমি করবো কি!হুট করে এতগুলা বই কেনা হয়তো উচিত হয়নি। আমার মনে হয় মেয়েটা আমাকে সবগুলা বই দেয়নি। দিলে মাথায় করে নিয়ে যাওয়া লাগতো। আমার ভাবনার মাঝে মেয়েটা আবারও ঢুকে পড়ে।

মুচকি হেসে বলে,

আপনার আর কষ্ট করে এখানে আসতে হবে না।আপনি এখন বাসাতেই বইগুলা পড়তে পারবেন।
মেয়েটার এমন কথায় আমি আগের কথার মানেটা বুঝতে পারি।

তারমানে ও বুঝে ফেলেছে আমি কিসের জন্যে প্রতিদিন এখানে আসি, অপেক্ষা করি। এখন আমাকে এতগুলা বই কেনাতে মেয়েটার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। কিন্তু আমার কি হবে। আর কি দেখা হবে না ওর সাথে। ভাবতে পারিনা। আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

আমার মন খারাপ দেখে আকাশ ও কাদে। যার জলে আমি ভিজে যাই। ভিজে যাই।

মেলা প্রায় শেষের দিকে। আমি এই একদিনই ফাইজাকে দেখার লোভ কোনমতেই সামলাতে পারলাম না। আমি এখন দাড়িয়ে আছি ফাইজার স্টলের একদম সামনের স্টলে। এখান থেকে ফাইজাকে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে লোকজনের ভীড়ে আবার ও
হারিয়ে ফেলছি।তবে ভীড় কমলে আবারও তার দেখা পাই। কিন্তু, এবার পেলাম না। ভীড় কমার সাথে সাথে ওর পাশের মেয়েটাকে দেখা গেলেও ফাইজাকে আর দেখা গেলো না। আমি এদিক ওদিক তাকালাম নেই।

হুট করে মেয়েটার হারিয়ে যাওয়াটা আমার মোটেই
ভাল লাগলো না। আমি সাহস যুগিয়ে এগিয়ে গেলাম, স্টলের সামনে।

একটু এগুতেই মেয়েটা একদম হুট করে আমার সামনে এসে দাড়ালো।

যেভাবে হুট করেই হারিয়ে গিয়েছিল ঠিক সেভাবে।

মেয়েটি কে এভাবে দেখে আমি কি বলবো ভেবে পেলাম না। ফাইজা আরও কিছুক্ষন চুপ থেকে একটু রাগি গলায় বললো,

আপনাকে না বারন করেছিলাম আসতে। তবুও এসেছেন, কেন? ফাইজার প্রশ্নে আমি চুপ থাকি। এর উত্তরটা আমাকে অবশ্যই ঠিকভাবে গুছিয়ে বলতে হবে। নইলে একদম ধরা পড়ে যাব। আমি একটু
চুপ থেকে বলি,

ওইতো, বইগুলো পড়ে শেষ করলাম। এখন নতুন বই লাগবে। সেগুলোই কিনতে আসছি।

এতগুলা বই এই কয়েকদিনেই শেষ?

না মানে, কয়েকটা বই ফ্রেন্ডদের গিফট করলাম আর যেগুলা ছিল ওই গুলা আমি পড়লাম।

আমার কথাটা ফাইজার হয়তো খুব একটা পছন্দ হলো না। মেয়েটা আরও কিছুটা চুপ থেকে বললো,

তাহলে আয়ানের পড়ার টেবিলে যে বইগুলা দেখলাম ওই বইগুলা কার, হুম?

ফাইজার কথায় আমি একটু অবাক হলাম। একটু না, বেশ ভালই অবাক হলাম। আমি যে বইগুলা আয়ানকে দিয়ে দিয়েছি এ মেয়ে জানলো কিভাবে!

আমার চুপ থাকা দেখে ফাইজা আবারও বললো,
কি ভেবেছেন আমি কিছু জানিনা। আয়ানকে যেহেতু আমি পড়াই সে হিসেবে বইগুলা কে দিয়েছে সেটাও কিন্তু আমার জানার কথা।

আর আপনি যে আয়ানের খালাতো ভাই এটাও আমি জানি। ফাইজার কথায় আমি আবারও চুপ করে থাকি।বলার মত কিছু খুজে পাই না। বইগুলা দিয়ে আমিই বা কি করবো। সে হিসেবে আয়ানকে পুরো বইয়ের প্যাকেজটাই দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই মেয়েটা
যে আয়ানকে পড়ায় এটা জানা থাকলে কোন মতেই আমি বইগুলা পিচ্চিটাকে দিতাম না। কিন্তু আমি ধরা পড়ে গেছি। নতুনভাবে মিথ্যে বলারও কিছু পাচ্ছি না।

আমি মনে এবার সাহস জুগিয়ে ফাইজার দিকে তাকিয়ে বললাম, আসলে আমার বই পছন্দ না। যে বইগুলা যত্নকরে তুলে দিল আমার তাকে পছন্দ।
আমার কথায় ফাইজা একটু রাগ দেখিয়ে বলে,
কিন্তু যার বই পছন্দ না, তাকে আমারও পছন্দ না।
কথাটি বলে মেয়েটা আর দাড়ায় না।হাটা দেয়। আমি আর অপেক্ষা করি না।ফাইজাকে ডেকে একটু জোরেই বলি,

তুমি চাইলে আমি হাজারটা বই কিনতেও রাজি।
আমার কথায় ফাইজা আর আগায় না দাড়িয়ে যায়।মেয়েটা উল্টো আমার দিকে আসে।সামনে দাড়ায়।

একটু চুপ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, বইগুলার মত আমাকেও তো আবার আয়ানের কাছে দিয়ে আসবে না?

ফাইজার কথায় আমি হাসি।মুচকি হেসে বলি,

উহু, বরং বইগুলা ফিরিয়ে আনবো।বাচ্চা ছেলে, বই
পড়তে পারবে না।

হু,কিন্তু অফিস বাদ দিয়ে আমার ভার্সিটির সামনে ও যেন আর না দেখি।

তাহলে আমাদের কি আর দেখা হবে না?
অবশ্যই হবে। কোথায়? কেন, তোমার খালার বাসায়।
মুচকি হেসে ফাইজা কথাটা বলার পর আমিও মুচকি হাসি। মেয়েটা লাজুক চোখে আমার দিকে তাকায়।

যে তাকানোয় কোন মিথ্যে নেই, নেই কোন অভিনয়।

আমি আবারও হারিয়ে যাই। ফাইজার চোখের দিকে তাকিয়ে। আমি এবার আর ফিরে আসতে চাই না। কোন ভাবেই না, কোন মতেই না।
Previous
Next Post »