মায়েরা সত্য কথা বলেন ~ WriterMosharef

মায়েরা সত্য কথা বলেন

মায়েরা, সত্য কথা বলে, মায়েরাই, মায়েরা এমনই হয়, আমার মায়েরা, সত্য বলে, সত্য বলেই, সত্য বলেছেন, সত্য কথা বলেছেন, সত্য কথা বলে, সত্য কথা বলেন, mayera sotto kotha, sotto bani, bolen, WriterMosharef

Hi I'm WriterMosharef

আমার মা মাঝে মধ্যেই বলত, একদিন তুই অনেক বড় হবি। এমন ভাবে বলত তার মুখের দিকে তাকালে মনে হতো সে যেন ঠিক তার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে, আমি অনেক বড় হয়ে যাচ্ছি।

আমি বলতাম- আর কতো বড় হবো মা, বড় তো হয়েই গেছি। মা বলত, ওরে ওই বড়র কথা বলছিনা।

অনেক বড় হবি মানে অনেক নাম কামাবি সবাই তোকে অনেক সন্মান করবে, দেখবি একদিন।

হাইস্কুলের ইংরেজী স্যার হয়ে কর্মজীবনে পা রেখে একধাপ বড় হোলাম। কর্মজীবনে ঢুকেই তো কেবল বড় হওয়া যায় না, পাড়া-পড়শি মাঝেমধ্যেই কথাবার্তা বলতে বলতে জিজ্ঞাসা করে বসত, বাবা বিয়েটা কবে করছ? এই প্রশ্নের উত্তর একজন অবিবাহিত পুরুষ
কিভাবে দিবে? এর কি কোন উত্তর হয়? বিয়ে কি মামলা-মোকদ্দমার মতন যে শুনানির তারিখ মুখস্ত করে রেখেছি জিজ্ঞাস করতেই বলে দিলাম? ইনিয়ে বিনিয়ে বলে দিতাম, করব দেখি।

ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে কিছু দুষ্ট বাঁদড় থাকে না?

সারাক্ষণ স্যারদেরকে জ্বালিয়ে মারে? আমারও এমন কিছু ছাত্র-ছাত্রী ছিল, প্রতিদিনকার বাড়ির কাজ ডায়েরিতে লেখার মতনই এদের আরেকটা কাজ ছিল, স্যারের বিয়ের খোঁজ-খবর নেয়া।

দু-তিনটা শুধু দুষ্টু বাঁদড় না একদম মিচকে শয়তান ছিলো, এরা মাঝে মধ্যে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে বসত, স্যার, চুল তো সব পেকে সাদা হয়ে যাইতেছে, বিয়া করবেন কবে?

আয়নায় বারংবার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও একটা সাদা চুলও খুঁজে পাইনি। বলেছিলাম না মিচকা শয়তান ওরা?

পাড়া-পড়শী, মিচকে শয়তানদের খপ্পরে পরে শেষ পর্যন্ত মা'র কথা মত বিয়েটা করে ফেললাম। পাড়া-পড়শী, আর ওই মিচকে শয়তান গুলো আছে না? সবগুলোকে পেট পুড়ে খাইয়েছি।

মাকে বিয়ের পর একদিন বললাম, মা তোমার ছেলে কি বড় হয়েছে?

মা বলল- আরও বড় হবি বাবা, দেখবি আরও অনেক বড় হবি।

বিয়ের কয়েক বছর পর আমাদের ঘর উজ্জ্বল করে জন্ম নিলো ঈশান আর জিসান। জিসানের জন্মের কিছুদিন পরই মা ওপাড়ে পাড়ি জমালেন। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও হাত ধরে আদর করে বলেছিল, অনেক বড় হবি বাবা, অনেক বড় হবি।

মায়ের মৃত্যুর পর কত বছর চলে গেল, মিচকা শয়তানগুলোর কথা এতদিন সত্যি হতে শুরু করল, চুলে পাক ধরতে শুরু করল, চামড়ায় ভাজ পরতে শুরু করল, তখন আর আয়নাতে নিজেকে বিশেষ দেখা হতো না।

আরও কিছুবছর ফুরিয়ে যাবার পর বুঝতে পেলাম, শরীরের ম্যাকানিজম আগের মতন আর কাজ করছে না, বিশ্রামে যাওয়া প্রয়োজন। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিশ্রামের সুপারিশ করার পর তারা তা গ্রহণ করে একটা বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করল।

অনুষ্ঠানে একে একে শিক্ষক জীবনের প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে প্রতি বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথেই কমবেশি দেখা হলো। কারও কারও সাথে অনেক বছর পর, কারও কারও সাথে রোজই দেখা হয়।

কেউ কেউ আজ জজ-ব্যারিস্টার হয়ে গেছে, কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার, মিচকা শয়তানগুলোর কয়েকটা নাম করা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে গেছে, সবাই যে অনেক কিছু হয়েছে তা না কয়েকটা
ঝরে পরেছে, মুদি দোকান নিয়ে বসেছে, নতুবা ছোটখাটো ব্যবসা নিয়ে আছে।

বাচ্চাগুলো সব আমার নিজের হাতে গড়া, কত
দুষ্ট-মিষ্ট সময় কেটেছে আমাদের। আজ একেকটার সামনে যেতেই গোটা হৃদয় বার বার কেঁপে উঠছে, মনে হচ্ছে, শরীরের একেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন শরীর থেকে খসে খসে পরে যাচ্ছে। বোকাগুলো আবার কাঁদে, পা ছুঁয়ে সালাম করে সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাদের মতন অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়, মনে হয় আমার বুকই তাদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল।

একেকটাকে জড়িয়ে ধরেই বোবা বনে যাই, অনেক কিছু বলতে চাই, কিন্তু মুখ থেকে কোন কথা বেরুয়
না। স্মৃতির প্লটে চিত্রায়িত হতে শুরু করে শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিনটি থেকে শেষ দিন পর্যন্ত।

আমি স্পষ্ট শুনতে পাই স্যার, চুল তো সব পেকে সাদা হয়ে যাইতেছে, বিয়া করবেন কবে?

স্যার, ঈদ তো চলে আসল, বকশিস দিবেন না?

স্কুলমাঠ থেকে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই বর্তমানে স্কুলে পড়া ছাত্র-ছাত্রীগুলো কান্না শুরু করে দিয়েছে, ছুটে এসে কেউ কেউ হাত আঁকড়ে ধরে বলছে, স্যার যায়েন না স্যার যায়েন না, বুকের ভেতরটা ফেটে চৌচির হয়ে গেলেও খুব শান্তি লাগছে, এতবছর পর মায়ের কথা সত্য হয়েছে, আমি বুঝতে পেরে গেছি আমি বড় হয়ে গেছি, অনেক বড় য়ে গেছি, জজ-ব্যারিস্টাররা পর্যন্ত আমার পা ছুঁতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করে না, তাদের
চোখের জল স্বাধীনভাবে অবিরত ঝরতে থাকে, এর চেয়ে বড় আর কি হবার আছে আমার?

অবসর নেবার পর থেকে আমার প্রতিদিনকার কাজসমূহ খুব সীমিত হয়ে গেছে, সকাল বিকেল পাড়া বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া, বেলকনিতে বসে থাকা এসবই আমার কাজ। বড় ছেলেটা ঈশান, ক'দিন হলো বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দেয়াতে বাড়ি এসেছে, আজ রাতের গাড়িতেই ফিরে যাবে।

রাতের খাবার শেষে বাড়ি থেকে বের হবার সময় আমার পা ছুঁয়ে সালাম সেরে মায়ের পা ছুতেই তার মা বলল, অনেক বড় হবি বাবা, অনেক বড় হবি।
Previous
Next Post »